দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে আসছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা। সেই ধারাবাহিকতায় এখন এই খাতে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকার বেশি। বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগের কারণে এই ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিলের পরিমাণও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিদ্যুৎ কেনা বাবদ জমে থাকা বকেয়া ইতোমধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এই বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩০০ কোটির বেশি।
এই বকেয়ার বড় অংশই বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে আছে। গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা ১১ হাজার ৬০০ কোটির বেশি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিল বকেয়া রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। গ্যাস ও জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানি বাবদ বকেয়া ১৭ হাজার কোটির বেশি। অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি ও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১৫ হাজার কোটির বেশি অর্থ পরিশোধ বাকি রয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও কয়েক হাজার কোটি টাকার বকেয়া জমে আছে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ বাবদও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ বকেয়া রয়েছে।
এই তথ্য সংসদে তুলে ধরা হয় ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন–এর এক প্রশ্নের জবাবে। বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ ও বকেয়ার এই দ্বৈত চাপ শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামগ্রিক জ্বালানি অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত দুই ধরনের ঋণের ওপর পরিচালিত হয়—চলতি মূলধন ঋণ, যা দিয়ে জ্বালানি আমদানি করা হয়, এবং প্রকল্প ঋণ, যা অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি স্থাপনে ব্যবহৃত হয়। এসব ঋণ নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিশোধ করতে হয় এবং সেই অর্থ আসে বিদ্যুৎ বিক্রির আয় থেকে। কিন্তু বকেয়া বিলের কারণে এই অর্থপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পাওনা অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। কেউ কেউ পুরোনো ঋণ সামাল দিতে নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এতে ব্যাংকিং খাতেও ঝুঁকি বাড়ছে, কারণ ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি বাস্তব ও উদ্বেগজনক। তাদের মতে, বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপিতে পরিণত হতে পারে। তারা প্রস্তাব দিয়েছেন, বিশেষ বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ধাপে ধাপে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আরও মনে করেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা চাপ সামাল দিতে পারলেও বেসরকারি খাতের পক্ষে এই বিপুল ঋণের বোঝা বহন করা কঠিন। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং নতুন করে অর্থায়ন পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নিয়মিত অর্থপ্রাপ্তি না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগে ভাটা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সার্বিক চিত্র বলছে, বিদ্যুৎ খাতে ঋণ ও বকেয়ার পরিমাণ যে হারে বাড়ছে, তা এখন একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

