ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দেওয়ায় অনেক দেশই ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। শুরুতে বাংলাদেশ এই পথে না গেলেও গত শনিবার রাতে সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণা দেয়।
বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে এবং তুলনামূলক বেশি দামে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে। এতে করে অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ কমাতে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দাম বাড়ানোর মাধ্যমে কি সত্যিই বাজারে তেলের প্রাপ্যতা ও সরবরাহজনিত ভোগান্তি কমবে? একই সঙ্গে এই মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে জনজীবনে যে চাপ সৃষ্টি করবে, তা সাধারণ মানুষ কীভাবে মোকাবিলা করবে—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তবে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি শুরুতে কিছুটা অপেক্ষার নীতি নিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ দ্রুত না পড়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানো ছাড়া কার্যত আর কোনো বিকল্প থাকেনি।
তবে শুধু দাম বাড়ানোর আগেই নয়, সংকটকালেও জ্বালানি তেল নিয়ে ভোগান্তি স্পষ্ট ছিল। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট ও বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, যা পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সরকারি ব্যাখ্যার মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনো অনুপস্থিত।
সংকট ব্যবস্থাপনায় শুরুতেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে। সন্ধ্যার পর দোকান ও শপিং মল বন্ধের সিদ্ধান্ত দেরিতে এসেছে। একইভাবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ফুয়েল পাস বা ডিজিটাল অ্যাপ চালুর মতো উদ্যোগও সময়মতো বাস্তবায়ন হয়নি। শুরুতেই এসব ব্যবস্থা চালু করা গেলে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, অপচয় কমানো এবং মজুতদারি রোধ করা তুলনামূলক সহজ হতো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
গত শনিবার রাতের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার যুক্তিতে সরকার এই মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক বললেও সাধারণ মানুষের জীবনে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বিশেষ করে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিবহন ও কৃষিখাতে এই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেলনির্ভর। বাস, ট্রাক থেকে শুরু করে কৃষকের সেচযন্ত্র—সবই এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারে পড়বে। ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষকে নতুন করে আরও চাপের মুখে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, দাম বাড়ানোর পরেও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ভোগান্তি দূর না হলে জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে। তাই অবিলম্বে সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর করা জরুরি হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল কিউআর কোড বা অ্যাপভিত্তিক ফুয়েল পাস ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে যে চাপ তৈরি হবে, তা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

