মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করছে। এর সবচেয়ে বড় ও তীব্র প্রভাব পড়বে স্বল্প আয়ের দেশগুলোয়—এমনই সতর্কবার্তা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই আশঙ্কার কথা জানান। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, উন্নত দেশগুলো এখনো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে তুলনামূলকভাবে আশাবাদী। তবে উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো ইতোমধ্যে একাধিক দিক থেকে চাপের মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি, খাদ্য ও সার—এই তিন খাতে মূল্যবৃদ্ধি তাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন বলে জানা গেছে। ইউরোপের একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পরিস্থিতিকে “বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তুরস্কের অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ফাতিহ বিরল বলেন, যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটের প্রভাব সব দেশ সমানভাবে অনুভব করবে না। তার মতে, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ, যাদের আন্তর্জাতিক পরিসরে কণ্ঠ তুলনামূলকভাবে দুর্বল, তারা এই সংকটের প্রধান শিকার হবে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, “যুদ্ধ যদি আগামীকালও শেষ হয়, তবুও এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গভীর ঝুঁকি হিসেবে থেকে যাবে।” তিনি জানান, গত দেড় মাসে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে অনেক দেশকে অতিরিক্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে আফ্রিকার পাঁচ থেকে আটটি দেশ বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হলেও জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে। কাঁচা তেলের প্রবাহ শুরু হলেও শোধনাগারগুলোর কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সংকটের প্রভাব দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান অঞ্চলের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই যুদ্ধের কারণে।
পিটারসন ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোজেন বলেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো এখন তিন দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছে—জ্বালানি, খাদ্য ও সারের উচ্চমূল্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী মার্কিন ডলার। ফলে এসব দেশে উৎপাদন খাত দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ইথিওপিয়া থেকে সিয়েরা লিওন পর্যন্ত, জ্বালানি সংকট ছড়িয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থায়। অনেক জায়গায় এই সংকট সমাজের ভেতর বৈষম্যও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যাকে অর্থনীতিবিদরা “কে-শেপ অর্থনীতি” হিসেবে উল্লেখ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়ন ও জ্বালানি রপ্তানির কারণে দেশটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক থাকতে পারে। তবে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ এখনো পেট্রোল পাম্পে উচ্চমূল্যের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে ধনী শ্রেণি শেয়ারবাজারের উত্থান ও কর সুবিধা থেকে লাভবান হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফ বিভিন্ন দেশের সরকারকে লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক ভর্তুকি ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছে। তবে পাকিস্তানের সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর রেজা বাকির মনে করেন, রাজনৈতিক বাস্তবতায় খাদ্য ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো অনেক সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ দাম বাড়লে জনঅসন্তোষের ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর অর্থমন্ত্রী ডুডু রাসেল বলেন, যেসব দেশ গত কয়েক বছরে কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে, তারা এই সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলক শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পথে ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে গেছে। নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে কমে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০২৭ সালে তা সামান্য বেড়ে ৩ শতাংশ হতে পারে।

