প্রান্তিক এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে ২ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নেক্সট জেন’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আধুনিক ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। তবে বৈদেশিক ঋণনির্ভর এই উদ্যোগ ঘিরে ব্যয় কাঠামোতে অতিরঞ্জনের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্প প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে, যেখানে ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হিসেবে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া শতকোটি টাকার সফটওয়্যার ও ই-লার্নিং কনটেন্ট তৈরি করা হলেও সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো আলাদা পরিকল্পনা রাখা হয়নি। এমনকি প্রকল্পে গাড়ি ভাড়ার বাজেট রাখার পরও যাতায়াত খাতে আবার পৃথক বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি নীতিগতভাবে ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং সম্ভাব্য অনিয়মের সুযোগ রয়ে গেছে। তাদের আশঙ্কা, এসব খাতে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ অপব্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মাউশি সূত্র জানায়, শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। ওই সময়ে এডিবির ঋণের ২ হাজার ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার পাশাপাশি বাকি অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে জোগানের পরিকল্পনা ছিল। তবে সরকারের অনাগ্রহের কারণে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় কমিয়ে ৪ হাজার ৭ কোটি টাকায় প্রস্তাব পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে সেটিও গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় সর্বশেষ ধাপে ব্যয় আরও কাটছাঁট করে শুধুমাত্র এডিবির ঋণ ২ হাজার ৮৪৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও এখনো এটি একনেকের অনুমোদন পায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আজ বুধবার প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
প্রকল্পের আওতায় এসব এলাকায় অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, আইসিটি ল্যাব স্থাপন এবং বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য আধুনিক সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্কুল পরিচালনা ও পাঠদানে দক্ষতা বাড়াতে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও রাখা হয়েছে।
এছাড়া একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক আইডি থাকবে। সেই আইডিতে শিক্ষাজীবনের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে পাঠ্যবইভিত্তিক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমে সহজে পড়াশোনা করতে পারে।
বিদেশ প্রশিক্ষণে ব্যয় ও অংশগ্রহণে ভারসাম্যহীনতা:
প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। দুই ধাপে ৩৬ জন এবং ১৮ জন করে মোট ৫৪ জনকে ৭ দিনের জন্য এশিয়া বা ইউরোপের কোনো দেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। জনপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। তবে এই ৫৪ জনের মধ্যে শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ১৫ জন। বাকি ৩৯ জনই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তা।
প্রথম ধাপে শিক্ষা প্রযুক্তি বাস্তবায়নে স্কুলপ্রধানদের ভূমিকা বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যাবেন ৩৬ জন। এ দলে রয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, মাউশি, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিট, এনসিটিবি, আঞ্চলিক ও জেলা শিক্ষা অফিস এবং অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তারা। এই ধাপে প্রধান শিক্ষক রয়েছেন ১৫ জন।
দ্বিতীয় ধাপে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যাবেন ১৮ জন। তবে এই ধাপে কোনো শিক্ষক নেই। বরং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন।
এ বিষয়ে এক প্রকল্প কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শেষে যারা ভালো করবেন, তাদের মধ্য থেকে ১৫ জনকে বিদেশে পাঠানো হবে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আমার জানা নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হয়েছে।” প্রকল্পটি ঘিরে যেমন আধুনিক শিক্ষার বড় সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তেমনি বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্নও উঠছে শিক্ষা খাতে সংশ্লিষ্ট মহলে।
শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে ব্যয় ফুলে-ফেঁপে দ্বিগুণ:
প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মোট ১ হাজার ৪৮৫টি স্কুলে অতিরিক্ত তিনটি করে শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কাজের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ফার্নিচার ছাড়া প্রতিটি স্কুলে তিনটি অতিরিক্ত কক্ষ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, একই ধরনের নতুন শ্রেণিকক্ষ বাস্তবসম্মতভাবে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মধ্যেই নির্মাণ করা সম্ভব। এই ব্যবধানের কারণে সংশ্লিষ্ট খাতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। ফলে শুধু এই একটি খাতেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ অনিয়ম বা অপব্যয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
শিক্ষা খাতের একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নির্মাণকাজ সাধারণত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের মতে, বাজেট অতিরিক্তভাবে নির্ধারণ করা হলে সেটি সম্ভাব্য লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই এই ব্যয় কাঠামো আরও গভীরভাবে যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে এই ব্যয় তাদের কাছেও বেশি মনে হয়েছে। তাই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে প্রাক্কলন চাওয়া হয়। তাদের দেওয়া হিসাবের ভিত্তিতেই বর্তমান ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই ব্যয় কমে বা বাড়তে পারে।”
প্রকল্প শেষেই ঝুঁকিতে শতকোটি টাকার তথ্যভান্ডার:
প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ‘নেক্সট জেন’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি সমন্বিত শিক্ষাবিষয়ক সফটওয়্যার তৈরি করা হবে। এতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক আইডি থাকবে, যেখানে তাদের শিক্ষাজীবনের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে পাঠ্যবইভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ের ডিজিটাল কনটেন্টও তৈরি করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এসব কনটেন্ট ব্যবহার করে সহজে পড়াশোনা করতে পারে।
এই সফটওয়্যার ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির জন্য প্রাথমিকভাবে ৭২ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এই ব্যয় আরও বেড়ে শতকোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে এসব শিক্ষার্থীর তথ্য ও ডিজিটাল কনটেন্ট সংরক্ষণের জন্য আলাদাভাবে ৬০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষে এই বিপুল ডাটা ও কনটেন্ট সংরক্ষণের জন্য কোনো স্থায়ী বাজেট বা রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা রাখা হয়নি। ফলে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তৈরি করা শতকোটি টাকার ডিজিটাল কনটেন্ট ও শিক্ষার্থীদের তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক। তার ভাষায়, “এত কষ্ট করে ই-কনটেন্ট ও শিক্ষার্থীদের ডাটা তৈরি করা হবে, কিন্তু প্রকল্প শেষে এগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তার কোনো স্থায়ী পরিকল্পনা বা বাজেট থাকা উচিত ছিল। তা না হলে এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”

