বিশ্বব্যাপী রেজিন বাজার দ্রুত সম্প্রসারণের পথে রয়েছে। শিল্প ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই বাজার আগামী দশকে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৬ সালে রেজিন বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ০২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি বেড়ে ২ দশমিক ৫৬৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই সময়কালে বাজারটির বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি থাকবে প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
রেজিন মূলত পাইন গাছের রজন থেকে উৎপাদিত হয়। বিশ্বজুড়ে বছরে এর উৎপাদন ১২ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে। সরবরাহ কাঠামোয় গাম রেজিনের অংশ প্রায় ৭০ শতাংশ এবং টল অয়েল রেজিনের অংশ প্রায় ২০ শতাংশ। একটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ৩ থেকে ৫ কেজি রজন সংগ্রহ করা যায়। ফলে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই প্রকৃতিনির্ভর হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিল্পক্ষেত্রে রেজিনের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে আঠা খাত একাই মোট চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ তৈরি করে। সামগ্রিকভাবে আঠা খাতে ব্যবহার হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। পাশাপাশি পেইন্ট ও কোটিংয়ে ২২ শতাংশ, প্রিন্টিং ইঙ্কে ১৮ শতাংশ, রাবারে ১৮ শতাংশ এবং কাগজ শিল্পে ১৭ শতাংশ ব্যবহার রয়েছে।
পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৮ শতাংশ উৎপাদন কেন্দ্র প্রভাবিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো বায়ো-বেসড বিকল্প ও উন্নত রেজিন এস্টার প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। নতুন প্রযুক্তির ফলে উৎপাদন দক্ষতা প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে এবং বর্জ্য কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। একই সঙ্গে উচ্চমানের রেজিনের চাহিদাও বেড়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও স্পেশালিটি কোটিংস খাতে এই চাহিদা প্রায় ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল এখনো রেজিন বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব উৎপাদনের প্রায় ৬৮ শতাংশ এখান থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। চীন থেকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। উত্তর আমেরিকায় টল অয়েল রেজিন উৎপাদন প্রধান ভূমিকা রাখছে, যা দেশীয় সরবরাহের প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব আঠার ক্রমবর্ধমান চাহিদা এই বাজারের অন্যতম প্রধান চালক। প্যাকেজিং ও নির্মাণ খাতে রেজিনভিত্তিক আঠার ব্যবহার প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত বিধিনিষেধের কারণে সিন্থেটিক রেজিন থেকে প্রাকৃতিক বিকল্পের দিকে স্থানান্তরও দ্রুত হচ্ছে।
রেজিন উৎপাদন পুরোপুরি বননির্ভর হওয়ায় জলবায়ু ও মৌসুমি পরিবর্তন সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলছে। প্রায় ২৬ শতাংশ উৎপাদন মৌসুমি ওঠানামার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া শ্রমনির্ভর সংগ্রহ পদ্ধতিও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ, যার পেছনে রয়েছে শক্তি ব্যয় ও পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি সিন্থেটিক বিকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাজারের জন্য একটি বড় চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ফার্মাসিউটিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স এবং স্পেশালিটি কেমিক্যাল খাতে রেজিনের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চ বিশুদ্ধতার রেজিনের চাহিদা প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি হাইড্রোজেনেটেড ও পলিমারাইজড রেজিন পণ্যের ব্যবহারও সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ বাজারকে আরও গতিশীল করতে পারে।
বাজার বিভাজন: উৎপাদন ও বাজার শেয়ারের হিসাবে—
- গাম রেজিন: প্রায় ৫২ শতাংশ
- টল অয়েল রেজিন: প্রায় ৩১ শতাংশ
- উড রেজিন: প্রায় ১৭ শতাংশ
বিশ্ব রেজিন বাজারে উল্লেখযোগ্য কোম্পানির মধ্যে রয়েছে হেক্সিয়ন, আরাকাওয়া, ফরকেম, পিনোভা এবং উঝো পাইন কেমিক্যালসসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান—উঝো পাইন কেমিক্যালস ও ফরকেম—মিলে প্রায় ২১ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশ্ব রেজিন বাজার এখন একটি রূপান্তরপর্বে প্রবেশ করেছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিস্তার, নতুন শিল্পখাতে ব্যবহার বৃদ্ধি এবং উৎপাদন দক্ষতার উন্নতির ফলে আগামী দশকে এই বাজার আরও স্থিতিশীলভাবে সম্প্রসারিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

