নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে চাল, চিনি ও ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের খরচের চাপ আরও বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে—যেখানে কিছু পণ্যের দাম স্থির রয়েছে, সেখানে কিছু পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এখন চোখে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ পরিবহন ব্যয়। বিশেষ করে ট্রাক ভাড়া বাড়ার প্রভাব এখন সরাসরি পণ্যের দামে পড়তে শুরু করেছে। যদিও সরকারিভাবে নতুন ভাড়া নির্ধারণ হয়নি, তবুও পণ্যবাহী ট্রাকগুলো আগেই নিজেদের ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ ঠিক থাকলেও দামের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি ডিজেলের লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পর থেকেই এই চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই ট্রাক ভাড়া ইতোমধ্যে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আর এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেট থেকেই যাচ্ছে।
চালের বাজারে পরিবর্তন তুলনামূলক ধীর হলেও তা স্থির নেই। মাঝারি মানের চাল—যেমন বিআর-২৮ ও পাইজাম—কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়ে এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল ৫৩ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে। মোটা চাল ও সরু চালের দাম আপাতত অপরিবর্তিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে পোলাওর চালে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে প্যাকেটজাত পোলাওর চালের কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে এখন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পোলাওর চালও পিছিয়ে নেই—কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় উঠেছে। ব্যবসায়ীরা নিজেরাও এই বৃদ্ধিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন। তাদের মতে, মিল পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণে খুচরা পর্যায়ে দাম না বাড়িয়ে উপায় থাকে না।
চিনির বাজারেও একই চিত্র। কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে খোলা চিনি এখন ১০০ থেকে ১০৫ টাকা, আর প্যাকেট চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়। যদিও দীর্ঘমেয়াদে চিনির দাম কিছুটা কমার তথ্য রয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
ডিমের বাজারে চাপ আরও বেশি। গত এক সপ্তাহে প্রতি ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে এখন ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৩০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতাদের মতে, অতিরিক্ত গরমে মুরগির মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে, ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা একই থাকায় দাম বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে মুরগির বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি এখন ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। একইভাবে সোনালি জাতের মুরগির দামও কিছুটা কমেছে।
সবজির বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। বেশির ভাগ সবজি ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। পটল, চিচিঙা ও ধুন্দলের মতো সবজির দামও এই সীমার মধ্যেই আছে। কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমে ৬০ থেকে ৯০ টাকায় নেমেছে, যা ভোক্তাদের জন্য সামান্য স্বস্তির খবর।
মাছের বাজারে আবার ভিন্ন চিত্র। বিশেষ করে ইলিশের দাম বেশ চড়া। ৫০০ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজিতে ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে খরচ হচ্ছে ২,২০০ থেকে ২,৪০০ টাকা। তেলাপিয়া, পাঙাশ ও চাষের কই মাছের দামও কিছুটা বেড়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু সাময়িক বাজার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এখানে একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা কাজ করছে।
প্রথমত, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খরচ বাড়ছে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সামান্য ভারসাম্যহীনতাও এখন বড় প্রভাব ফেলছে। যেমন—ডিমের ক্ষেত্রে সামান্য উৎপাদন কমলেই দাম দ্রুত বাড়ছে।
তৃতীয়ত, বাজারে প্রতিযোগিতা ও নজরদারির অভাবও একটি বড় কারণ। কিছু ক্ষেত্রে অযৌক্তিক দাম বাড়লেও তা ঠেকানোর কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।
বর্তমান পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে ডিজেলের নতুন দামের প্রভাব পুরোপুরি কার্যকর হলে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই আবার বাড়তে পারে। অর্থাৎ, এই ঊর্ধ্বগতি হয়তো কেবল শুরু—মূল চাপ এখনো পুরোপুরি আসেনি।
সব মিলিয়ে, নিত্যপণ্যের বাজারে এই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে। আয় না বাড়লেও খরচ বাড়ছে—এই বাস্তবতা এখন দেশের অধিকাংশ পরিবারের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

