বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে সাধারণত দেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তিগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, নারী অংশগ্রহণ—সব দিক থেকেই এই খাতের গুরুত্ব অনেক। কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালে যে কঠিন বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ পোশাক শ্রমিকের আয় ন্যূনতম মজুরির চেয়েও কম। শুধু তাই নয়, ৭ শতাংশ শ্রমিকের আয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে। অর্থাৎ যে খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস, সেই খাতেরই উল্লেখযোগ্য অংশের শ্রমিক জীবিকার মৌলিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।
জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন, সংক্ষেপে ইউএনএসকাপ, তাদের এক জরিপ প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরেছে। ৫৩টি সদস্য ও ৯টি সহযোগী সদস্য দেশের ওপর পরিচালিত এই প্রতিবেদনটি গত সোমবার প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন দেশের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বাড়তে থাকা প্রতিবন্ধকতা, বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ, এবং তার সামাজিক-অর্থনৈতিক অভিঘাত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই প্রতিবেদনটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এটি দেখিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের সামান্য ধাক্কাও কীভাবে দেশের পোশাকশ্রমিকদের জীবনে বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রম কাঠামো যে ভেতর থেকে কতটা দুর্বল, তা বোঝা যায় আরেকটি তথ্য থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৯২ শতাংশ শ্রমিকের চাকরির কোনো লিখিত চুক্তি নেই। এই তথ্য শুধু শ্রমিক অধিকারের দুর্বলতা নয়, বরং একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতির কথাও বলে। লিখিত চুক্তি না থাকলে কর্মঘণ্টা, মজুরি, ছুটি, ক্ষতিপূরণ, ছাঁটাই-পরবর্তী সুবিধা—কোনো কিছুই কার্যকরভাবে দাবি করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শ্রমিকের শ্রম আছে, কিন্তু সেই শ্রমের নিরাপত্তা নেই।
এখানেই শেষ নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ভেতরেও ঠিকা কাজ এবং বাসাবাড়িভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে পোশাক খাতের একটি অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে। অর্থাৎ অনেক শ্রমিক মূল কারখানার আনুষ্ঠানিক কর্মচারী নন, কিন্তু একই শিল্পের উৎপাদনচক্রে জড়িয়ে আছেন। এই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো নোটিশ পিরিয়ড থাকে না, নেই চাকরি টিকে থাকার নিশ্চয়তা, নেই সামাজিক সুরক্ষা। উৎপাদন কমে গেলে, অর্ডার বাতিল হলে বা রপ্তানি চাহিদা নেমে গেলে, এই শ্রমিকরাই প্রথমে কাজ হারান। আর নতুন করে কাজ শুরু হলে তারাও যে অগ্রাধিকার পাবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাড়তে থাকা বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ এবং বাজার বিভাজনের বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রভাব শুধু রপ্তানির পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ছড়িয়ে পড়বে শ্রমবাজার, পরিবার, নারী কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্যের চিত্রে। কারণ, তৈরি পোশাক খাতের মতো শ্রমনির্ভর শিল্পে চাহিদা কমে গেলে প্রথম আঘাত লাগে মজুরিতে, এরপর কর্মসংস্থানে, তারপর জীবনমানের ওপর।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার, অর্থাৎ আইএলও-এর প্রাক্কলন তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনমুখী খাতে দুই কোটি ৭০ লাখের বেশি চাকরি, বা মোট উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থানের ৯ শতাংশ, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মানে হলো—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমলে, শুল্ক বাড়লে বা আমদানি নীতিতে পরিবর্তন এলে তার অভিঘাত সরাসরি পড়ে উৎপাদনভিত্তিক কর্মসংস্থানে। বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে পোশাক ও পাদুকা শিল্পকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এই ঝুঁকির কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ভেতরেই আছে।
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত শুধু কোম্পানির ব্যবসায়িক হিসাব বদলাবে না, বরং তা দারিদ্র্য এবং আয়বৈষম্যও বাড়াতে পারে। কারণ, রপ্তানিকারকেরা অনেক সময় শুল্ক-পরবর্তী খুচরা মূল্যবৃদ্ধি এড়াতে নিজেদের মুনাফা কমানোর বদলে শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নেয়। এর মধ্যে থাকতে পারে মজুরি কমানো, বাড়তি সুবিধা কেটে দেওয়া, কাজের চাপ বাড়ানো, কিংবা অনানুষ্ঠানিক নিয়োগের ওপর বেশি নির্ভর করা। অর্থাৎ বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ এসে পড়ে সবচেয়ে নিচের স্তরের শ্রমিকের ঘাড়ে।
বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে প্রতিবেদনটি কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করেনি, কিছু বাস্তব শক্তির কথাও বলেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বিশ্বের একক বৃহত্তম পোশাক কর্মীবাহিনী কাজ করছে। এই শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৪৪ লাখ। এই পরিসংখ্যান দেশের অর্থনীতিতে খাতটির গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। তবে বড় কর্মীবাহিনী মানেই যে বড় সুরক্ষা, তা নয়—এই প্রতিবেদন তারই উল্টো দিক তুলে ধরেছে। যত বড় এই খাত, তার ঝুঁকিও তত বড়; বিশেষ করে যখন বড় একটি অংশ অনিরাপদ চুক্তি, নিম্ন মজুরি এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে কাজ করে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায় এই একক প্রধান বাজারে। এই নির্ভরতা অর্থনীতির ভাষায় সুযোগও, আবার ঝুঁকিও। বাজার বড় হলে রপ্তানি আয় বাড়ে, কিন্তু নির্ভরতা বেশি হলে সেই বাজারের নীতিগত পরিবর্তন, শুল্ক, চাহিদা পতন বা রাজনৈতিক চাপ সরাসরি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধাক্কা দেয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা—বাজার বৈচিত্র্য ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা কঠিন।
এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে পোশাক খাতের প্রতি ১০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় সাতজনই নারী। অর্থাৎ এই শিল্প শুধু রপ্তানির খাত নয়, এটি দেশের নারী কর্মসংস্থানেরও একটি প্রধান ভিত্তি। ফলে খাতটিতে সংকট বাড়লে তার প্রভাব পড়বে নারী আয়, পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যয় এবং সামগ্রিক সামাজিক অবস্থানের ওপর। পোশাক শিল্পে নারী অংশগ্রহণকে এত দিন উন্নয়নের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো—এই অংশগ্রহণ কি সত্যিই মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ কর্মসংস্থানে পরিণত হয়েছে, নাকি কেবল কম মজুরির শ্রমশক্তি হিসেবে নারীকে ব্যবহার করা হয়েছে?
অন্য দেশগুলোর তুলনামূলক চিত্রও প্রতিবেদনে রয়েছে। শ্রীলঙ্কায়ও প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় সাতজন নারী শ্রমিক, আর কম্বোডিয়ায় এই হার আরও বেশি—সেখানে প্রতি ১০ জনের মধ্যে আটজনই নারী। পাকিস্তানে তুলনামূলকভাবে এই হার কম, প্রতি ১০ জনে পাঁচজনের মতো। এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, পোশাক শিল্পে নারী শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরতা এ অঞ্চলে একটি সাধারণ প্রবণতা। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি স্পষ্ট বার্তাও দেয়—এই খাতের সংকট মানে শুধু শিল্পের সংকট নয়, এটি নারীকেন্দ্রিক শ্রমজীবী বাস্তবতারও সংকট।
মজুরিবৈষম্যের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভিয়েতনামের পোশাক খাতে নারীদের মজুরি পুরুষের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম। যদিও বাংলাদেশের জন্য এমন নির্দিষ্ট লিঙ্গভিত্তিক মজুরি ব্যবধানের হার প্রতিবেদনের এই অংশে উল্লেখ করা হয়নি, তবু আঞ্চলিক প্রবণতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—শ্রমনিবিড় শিল্পে নারী অংশগ্রহণ বেশি হলেই যে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়, তা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা নিম্ন মজুরি, অনিশ্চিত কাজ এবং সীমিত আলোচনার ক্ষমতার মধ্যে আটকে থাকেন।
কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তথ্যও এই আঞ্চলিক বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম্বোডিয়ার পোশাক, বস্ত্র ও পাদুকা খাতে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। পাকিস্তানে পোশাক খাতের শ্রমিকসংখ্যা দেশটির উৎপাদনমুখী শিল্পের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সেখানে বস্ত্র ও পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ৮০ থেকে ৮৭ শতাংশই অনিবন্ধিত বা অনানুষ্ঠানিক। শ্রীলঙ্কায় পোশাক উৎপাদন খাতে আনুষ্ঠানিক খাতে প্রায় তিন লাখ কর্মসংস্থান রয়েছে, এর বাইরে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সমপরিমাণ, অর্থাৎ আরও তিন লাখ শ্রমিক নিয়োজিত আছেন, যারা কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব তথ্য দেখায়, এই সংকট কোনো এক দেশের একক সমস্যা নয়; বরং এটি পুরো অঞ্চলের শ্রমকাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন দুটি। প্রথমত, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কি শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে? দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক বাজারের চাপ সামলাতে গিয়ে রাষ্ট্র ও শিল্পমালিকেরা কি শ্রমিকের নিরাপত্তাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন? একটি খাত যখন ৪৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত, তখন সেটিকে শুধু উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাব দিয়ে বিচার করলে চলবে না। সেখানে শ্রমিকের আয়, চাকরির নিশ্চয়তা, লিখিত চুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা, পুনর্নিয়োগের সুযোগ, এবং নারী শ্রমিকের মর্যাদা—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এই বাস্তবতায় নীতিনির্ধারণের জায়গায়ও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন আছে। শুধু নতুন বাজার খোঁজা বা রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেই হবে না; একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, উৎপাদনের চাপ যেন শ্রমিকের ঘাড়ে গিয়ে না পড়ে। লিখিত চুক্তিকে বাধ্যতামূলক করা, অনানুষ্ঠানিক কাজকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা, এবং ন্যূনতম মজুরির নিচে আয় বন্ধে কার্যকর নজরদারি ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ, যে শ্রমিক উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি, তার জীবন যদি নড়বড়ে হয়, তবে শিল্পের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না।
সব মিলিয়ে, ইউএনএসকাপের এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের পোশাক খাতকে নতুন করে দেখার সুযোগ দিয়েছে। বাইরে থেকে এই খাতকে শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এটি বহন করছে কম মজুরি, অনিশ্চিত চাকরি, অনানুষ্ঠানিক শ্রম এবং বৈশ্বিক বাজারনির্ভরতার গভীর চাপ। ৩২ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরির নিচে, ৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে, আর ৯২ শতাংশের কোনো লিখিত চুক্তি নেই—এই তিনটি তথ্যই যথেষ্ট বোঝাতে যে পোশাকশিল্পের সাফল্যের গল্প এখন আর শুধু রপ্তানির অঙ্কে লেখা যাবে না। এটিকে নতুন করে লিখতে হবে শ্রমিকের জীবন, অধিকার এবং নিরাপত্তার ভাষায়।

