২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বা উন্নয়ন ব্যয়ের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি ছিল দুই লাখ কোটি টাকা। সেই তুলনায় নতুন প্রস্তাবিত এডিপি প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
নতুন বাজেট কাঠামোয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। এই খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে এডিপি বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা অর্থাৎ এক বছরে বাড়ছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এডিপির অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধরা হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
বড় বরাদ্দ পাচ্ছে যেসব খাত: প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, প্রায় ৩৬ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে—
- সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ: প্রায় ৩২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা
- স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ: প্রায় ২০ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা
- বিদ্যুৎ বিভাগ: প্রায় ১৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: প্রায় ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা
- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়: প্রায় ১৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা
- মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ: প্রায় ১৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা
- নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়: প্রায় ১১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা
- পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়: প্রায় ৯ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা
- কৃষি মন্ত্রণালয়: প্রায় ৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা
বাজেটের আকার ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এডিপির এই আকার বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল প্রবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় সাশ্রয়ী হওয়াই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তার মতে, জ্বালানি ব্যয় ও ভর্তুকি বাড়ছে, অথচ রাজস্ব আয় দুর্বল। ফলে তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
এডিপি বাস্তবায়নের চিত্র:
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শুরুতে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, পরে সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকায় নামানো হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ৬৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। এটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগের বছরগুলোতে বাস্তবায়ন ছিল—
- ২০২৪-২৫: ২৯.৮৭ শতাংশ
- ২০২৩-২৪: ৩৩.৬৫ শতাংশ
- ২০২২-২৩: ৩৪.৭৪ শতাংশ
- ২০২১-২২: ৩৮.৬০ শতাংশ
এডিপির কিছু খাতে অগ্রগতি আরও কম। যেমন জননিরাপত্তা বিভাগে ৩.৭৯ শতাংশ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৮.৮৬ শতাংশ, আর সংসদ সচিবালয়ে কোনো ব্যয় হয়নি। চলতি অর্থবছরে শেষ চার মাসে বাকি প্রায় ৭০ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে। এটি সময় ও সক্ষমতা—দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেটের আকার সাশ্রয়ী করা জরুরি। রাজস্ব দুর্বলতা ও বৈদেশিক সহায়তার অনিশ্চয়তার মধ্যে এত বড় এডিপি বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
তিন লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসহ কিছু খাতে বড় বরাদ্দ বাড়ানো হলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ ও ধীর বাস্তবায়ন গতি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

