বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে নামতে পারে। আগামী অর্থবছরে এটি আরও কমে ৪.৩ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলেছে, প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। অর্থাৎ তিনটি বড় আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসেই প্রবৃদ্ধির ধীরগতির ইঙ্গিত মিলছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাতের প্রভাবে গড় মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দেশীয় অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি শিগগিরই দুই অঙ্কের ঘর অতিক্রম করতে পারে।
আইএমএফ আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশ থাকতে পারে, যা ২০২৭ সালে সামান্য বেড়ে ৩.২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে ব্যয় সংকোচন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃচ্ছ্রসাধনমূলক নীতি গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে রাজধানীতে সম্প্রতি ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব’ বিষয়ক এক গবেষণা ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা উঠে আসে। সেখানে বক্তৃতায় অতীত সরকারের ভূমিকা তুলে ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, ১৯৯১ সালে বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় ছিল এবং পরে তা গতিশীল হয়। আবার ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময় অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল বলেও মন্তব্য করা হয়। একইসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক (২০০০ সালভিত্তিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত) উল্লেখ করে অতীত সরকারের সময়ে দুর্নীতির পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেওয়া হয়। তবে দুর্নীতি বা অর্থনৈতিক সংকট কোনো একক সময় বা সরকারের ফল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে এটি যুক্ত।
বৈশ্বিক সংঘাত যেমন রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অতীতেও সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিতে। যুক্তরাষ্ট্রেও অতীতে মূল্যস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল—এমন উদাহরণও তারা তুলে ধরেন। সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদদের ধারণা, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে সংকটকে সুযোগে রূপান্তরের উদাহরণ নতুন নয়। ২০০৭–০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় অনেক দেশে খাদ্য সংকট ও দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। তবে সেই কঠিন সময়েও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও বড় ধরনের খাদ্য সংকট তৈরি হয়নি।
সে সময় চীনের রপ্তানি নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দেশটি স্বল্পমূল্যের তৈরি পোশাকের পরিবর্তে উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে স্বল্পমূল্যের পোশাকের একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত বাজার দখল করে নেয়। ফলে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নামেনি, বরং খাতটি আরও বিস্তৃত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মেয়াদ এখনো অনিশ্চিত। যুদ্ধ দীর্ঘ না-ও হতে পারে বলে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সংঘাত কমে এলে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও স্বল্পমূল্যের তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন করে রপ্তানি বাজারে অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পেতে পারে।
তবে বাস্তবতা এখন চ্যালেঞ্জিং। যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের প্রধান দুই বৈদেশিক আয়ের খাত—তৈরি পোশাক ও জনশক্তি রপ্তানি—চাপের মুখে পড়েছে। গত আট মাস ধরেই রপ্তানি আয় কমছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, গত মার্চে পণ্য রপ্তানি আয় ছিল ৩৪৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮.৭ শতাংশ কম।
এই সময়ে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল, চামড়া, পাট ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য বলছে।
এ পরিস্থিতিতে দ্রুত বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। আর দাম ১২০ ডলারে পৌঁছালে এই ব্যয় ৪–৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ কারণে চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষি খাতও ঝুঁকির বাইরে নয়। আগামী জুন পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন সার মজুদ রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ঘাটতি প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। তাই দ্রুত সার আমদানির ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল রাখা গেলে খাদ্যপণ্যের দামে বড় ধরনের চাপ পড়বে না। অন্যথায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। গত কয়েক বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান থাকায় দারিদ্র্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় দুই-ই বেড়েছে। করোনার সময় অনেক পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত ঘিরে মুসলিম দেশগুলোও নানা ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে। এই অস্থিরতার কারণে পুরো অঞ্চলেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি মুসলিম দেশ, যেখানে বাংলাদেশের বড় একটি অংশের কর্মী কাজ করেন, সেগুলো বর্তমানে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। ফলে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ দেশে ফেরার চিন্তাও করছেন, আবার অনেকেই স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি নিয়েই অবস্থান করছেন।
পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ভিন্ন চিত্রও তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে পুনর্গঠন ও নির্মাণ খাতে বড় ধরনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে সময় বিপুল শ্রমশক্তির চাহিদা তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অন্যতম দুই খাত হলো তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং জনশক্তি রপ্তানি। এর মধ্যে পণ্য রপ্তানি এখনো শীর্ষে থাকলেও জনশক্তি রপ্তানির গুরুত্ব অর্থনীতিতে ক্রমেই বাড়ছে। কারণ, এই খাত থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পুরো অংশই সরাসরি অর্থনীতিতে যোগ হয়।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতে আয়ের একটি বড় অংশ কাঁচামাল ও মূলধনী পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়। ফলে প্রকৃত মূল্য সংযোজন তুলনামূলকভাবে কমে যায়। তবে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে এমন কোনো আমদানি নির্ভরতা নেই, যা এটিকে অর্থনীতির জন্য আরও কার্যকর খাত হিসেবে বিবেচিত করে।
বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত, যার বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে। এই বিপুল কর্মসংস্থান দেশের বেকারত্ব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তবে বৈশ্বিক সংঘাত ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে শিল্প খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে স্থিতিশীল রাখতে জ্বালানি ভর্তুকি ও উৎপাদন সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে। একই সঙ্গে নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান এবং তুলনামূলক স্বল্পমূল্যের পণ্য উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক সংকটকে শুধু ঝুঁকি হিসেবে না দেখে সম্ভাবনা হিসেবেও বিবেচনা করা দরকার। তাদের ভাষায়, ইতিহাসে দেখা গেছে—সংকটের সময়ই অনেক দেশ নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি যেমন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি সঠিক কৌশল গ্রহণ করা গেলে এটি বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিতে পারে।
- লেখক: ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, প্রফেসর ইমেরিটাস ও সাবেক উপাচার্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত।
সিভি/এম