দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। সংস্থাটির হিসাবে, গত পাঁচ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর গড় বার্ষিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
গত শনিবার ঢাকায় পিআরআই-এর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় এই তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক বাজলুল হক খন্দকার। সেখানে তিনি বাংলাদেশের সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কাঠামো পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, একটি পরিবর্তনশীল অর্থনীতির জন্য উচ্চ ও জটিল পরোক্ষ কর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
পিআরআই-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অঞ্চলের মধ্যে অন্যতম উচ্চ পরোক্ষ করহার আরোপ করছে। বিশেষ করে পানীয় পণ্যে করহার ৪৩.৭৫ শতাংশ, যেখানে ভারতে এটি ৪০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৩০ শতাংশ।
খন্দকার আরও বলেন, কর কাঠামোর ভেতরে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অ্যালকোহলযুক্ত বিয়ার-এর ওপর করহার ২৫০ শতাংশ হলেও এনার্জি ড্রিঙ্কের ওপর তা ৫৫ শতাংশ। এ ধরনের পার্থক্য ভোক্তাদের আচরণে বিকৃতি তৈরি করছে এবং শেষ পর্যন্ত রাজস্ব দক্ষতা কমিয়ে দিচ্ছে।
পিআরআই সতর্ক করে জানিয়েছে, ঘন ঘন এবং পূর্বানুমানহীন করনীতির পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ফলে বহু বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে থাকা বা বাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। সংস্থাটি মনে করে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করতে হলে “বিনিয়োগবান্ধব কর-নিশ্চয়তা” নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকা এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের প্রেক্ষাপটে পিআরআই বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।
প্রথমত, কর আরোপের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে সম্পূরক শুল্ককে ভ্যাট ভিত্তি থেকে আলাদা করে একক পর্যায়ে আরোপ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে করের ওপর কর আরোপ (ক্যাসকেডিং ইফেক্ট) এড়ানো যায়।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ পণ্যের দামের ওপর নয়, বরং চিনি বা অ্যালকোহলের পরিমাণের ভিত্তিতে কর নির্ধারণ করলে খাদ্য ও পানীয় খাতে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি।
তৃতীয়ত, কর প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করতে উন্নত তথ্যভাণ্ডার তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এসডি ও ভ্যাটের শ্রেণিভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নজরদারি, বাস্তবায়ন ও নীতি প্রণয়ন আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে মনে করে পিআরআই।

