প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস ডিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক আয়োজন। এ আয়োজনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তরফে যারা সিঙ্গাপুরের বৃহত্তর দায়িত্ব নিচ্ছেন তাদের অভিনন্দন জানাই এবং গোটা দেশের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে কেমন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়া উচিত তা পুনরায় পর্যালোচনা করি।
এজন্য প্রশাসন সার্ভিসের প্রধান লিও ইপের প্রশাসনিক অবদান স্বীকারের মাধ্যমে শুরু করতে চাই। দীর্ঘ ৪৩ বছর নিবেদিতভাবে সেবা দেয়ার পর তিনি অবসর নিয়েছেন। আমি লিওকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি। লিও পুলিশ অফিসার হিসেবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরো অনেক সংস্থায় শীর্ষস্থানীয় পদে গিয়েছেন। ২০০৩ সালে নাইন-ইলেভেন-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা এবং সার্স মহামারীর পরবর্তী সময় লিও ‘ওয়ার্কফোর্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি’ (ডব্লিউডিএ) প্রতিষ্ঠা করেন।
আমাদের জনশক্তিকে নতুনভাবে প্রশিক্ষণ ও দক্ষভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজনে সাড়া দিতেই এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এটিই আজকের ‘স্কিলস ফিউচার’-এর মতো প্লাটফর্মের ভিত্তি গড়েছে। বিগত এক দশকে সিভিল সার্ভিসের প্রধান হিসেবে লিও প্রশাসন ব্যবস্থার সুর ও প্রত্যাশা নির্ধারণ করেছেন। জনপ্রশাসনকে তিনি গভীরভাবে রূপান্তরিত করেছেন এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পুনরুজ্জীবিত করেছেন। করোনা মহামারীর সময়ে লিও জনপ্রশাসনকে অবিচল রেখেছেন। মহামারীর প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে প্রচেষ্টার সমন্বয় করেছেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা শূন্যস্থানগুলো পূরণ করেছেন। মহামারীকালেও সিঙ্গাপুরকে এগিয়ে নিতে সম্পদের সুষ্ঠু পরিচালনা করেছেন। জনপ্রশাসনের উন্নয়নে তার যত্ন এক প্রজন্মের তরুণ কর্মকর্তাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এজন্য তিনি পুরোপুরি অবসর নিয়েছেন এমনটি বলা যাবে না।
আরো দুজন অবসরপ্রাপ্ত স্থায়ী সচিব এন বাং চিকুন ও কিংকিয়ংয়ের অবদানকেও স্বীকৃতি দেয়া জরুরি। চিকুন দীর্ঘ ৪১ বছর সেবার পর গত বছর ডিসেম্বরে অবসর নিয়েছেন। বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি সিকিউরিটি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ডিভিশনের (এসআইডি) পরিচালক হিসেবে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেন। তার প্রতিবেদনগুলো স্বচ্ছ, গবেষণালব্ধ ও বিশ্লেষণবহুল। স্মার্ট নেশন এবং ডিজিটাল গভর্নমেন্টের প্রথম স্থায়ী সচিব হিসেবে চিকুন আমাদের ডিজিটাল গভর্নমেন্টে যাত্রা শুরু করেছিলেন।
তিনি ‘গভটেক’ গঠনে সহযোগিতা করেন, যা ডিজিটাল ক্ষমতায়নের প্লাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। আজ প্রযুক্তি আমাদের কাছে অনেক সহজলভ্য, যেমন সিংপাস ও মাই ইনফো। পরবর্তী সময়ে জনসম্পদ সচিব হিসেবে তিনি আমাদের ত্রিপক্ষীয় অংশীদারদের সঙ্গে প্লাটফর্ম ওয়ার্কার্স অ্যাক্ট, ওয়ার্কপ্লেস ফেয়ারনেস অ্যাক্ট এবং আমাদের প্রগতিশীল মজুরি মডেলের মতো প্রধান উদ্যোগগুলো তৈরি এবং বাস্তবায়নে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। এদিকে কিংকিয়ং ৩৫ বছর সেবা দিয়েছেন এবং আগামী জুনে অবসর নেবেন। তবে তার অবসর মঞ্জুর হবে কিনা এ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
অনেকগুলো দায়িত্বে কাজ করলেও তার উল্লেখযোগ্য কিছু হলো ইন্টারনাল সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের (আইএসডি) ডিরেক্টর, আইন সচিব, পরিবহন সচিব এবং অবশেষে স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবে কাজ করা। তার বাস্তবমুখী অথচ দূরদর্শী নেতৃত্ব সিঙ্গাপুরের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার পদ্ধতি এবং সিঙ্গাপুরবাসীর ক্ষতি থেকে রক্ষা করার কর্মপন্থাকে রূপান্তরিত করেছে। তিনি বৈদেশিক হস্তক্ষেপ মোকাবেলা এবং জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য উদ্ভাবনী আইন তত্ত্বাবধান করেছেন। তিনি এইচটিএক্স (হোম টিম সায়েন্স অ্যান্ড টেক এজেন্সি) গঠনে সহায়তা করেছেন। এমনকি এজন্য প্রযুক্তি ও নতুন ব্যবস্থাপনাগত ধারণা নেয়ার জন্য বরাবর চাপ দিয়েছেন।
হোমফ্রন্ট ক্রাইসিস এক্সিকিউটিভ গ্রুপের (এইচসিইজি) চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি করোনা মহামারীর সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ সময় তিনি একাধিক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয় ও সংহতি স্থাপন করেন। মহামারীকালে সিঙ্গাপুরের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি মাল্টি-মিনিস্ট্রি টাস্কফোর্সের জন্য সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন। এমনকি বর্তমান ইরান যুদ্ধের সময়ও কিংকিয়ং আমাদের জাতীয় প্রতিক্রিয়া সমন্বয় করতে এইচসিইজির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ তিন কর্মকর্তা এমন এক দলের অন্তর্ভুক্ত, যারা সিঙ্গাপুরে সুশাসন নিশ্চিত করে জাতির সাফল্যে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।
ভালো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও একটি ভালো লোকপ্রশাসন অভিন্ন লক্ষ্যে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলে সাফল্য মেলে। সিঙ্গাপুরের জনপ্রশাসন প্রথম সারির জনসেবা নিশ্চিত করে। এখানে শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী সরকারি নীতি তৈরি এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণকে উচ্চমানের সেবা দেয়া যায়। নাইন-ইলেভেন, সার্স মহামারী এমনকি করোনা মহামারীর সময়েও বহু প্রশাসনিক কর্মকর্তা শীর্ষ পদে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে সংকটকালেও সিঙ্গাপুর এগিয়ে গেছে এবং যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পেরেছে। এসব কারণে সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক কাঠামো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা হলো ‘জেনারালিস্ট’ হওয়া। একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা তার চাকরি জীবনে একাধিক মন্ত্রণালয় কিংবা বিভিন্ন সংস্থায় পদায়ন পেয়ে থাকেন। এভাবে বিভিন্ন ইস্যু এবং সেগুলোর সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা যায়। কর্মকর্তাদের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। আবার অভ্যন্তরীণভাবে পেশাদার ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কাজ করতে হয়। পাশাপাশি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে ফলাফল নিশ্চিত করতে অন্য মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজও করতে হয়। তাই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ দেখতে হবে এবং নিজ মন্ত্রণালয়ের মূল বিষয়গুলো শনাক্ত করতে হবে।
তবে ‘জেনারালিস্ট’ হওয়ার অর্থ এই নয় যে নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের অভাব থাকবে বা কেবল বুদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা দিয়েই কেউ দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হবেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নানা বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। জাতীয় পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অবস্থা এবং ভূরাজনীতির সঙ্গে সিঙ্গাপুরের সম্পর্কের ধরন এবং বিশ্ব অর্থনীতি কীভাবে আমাদের প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখতে হবে। সরকারের মৌলিক নীতিগুলো যেমন বহুত্ববাদ, ন্যায়বিচার, মেধা ও আইনের শাসন বুঝতে হবে। কেন এগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে প্রয়োগ করতে হয় তা জানতে হবে। নিজ নিজ মন্ত্রণালয় কীভাবে কাজ করে এবং এর মূল কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যকে বুঝতে হবে।
নীতিগুলোর কার্যকারণ বুঝতে হবে। এসব নীতি কীভাবে এল, পেছনের যুক্তি কী, বাস্তবায়নের সময় কী শেখা গেছে এবং ঘাটতি কোথায়—এসব বুঝতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে আমরা এগুলো আরো উন্নত করতে পারি। জাতি হিসেবে আমরা শূন্যাবস্থায় নেই যে নতুন করে সব আবিষ্কার করতে হবে। দীর্ঘ ৬০ বছর ধৈর্যের সঙ্গে কাজ, নীতি প্রণয়ন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে উদ্ভাবন এবং উন্নতির ফসল হিসেবে আমরা টেকসই অর্থনীতি পেয়েছি। এ টেকসই হওয়ার যাত্রাপথ সম্পর্কে নতুন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপযুক্ত জ্ঞান রাখতে হবে।
স্থল পরিবহনে কীভাবে সীমিত ভূমি ব্যবহার করে গণপরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি ও অর্থায়ন হয়, স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় করা যায় বা পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কীভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হয়—এসব কৌশল সম্পর্কে নতুনদের যুগোপযোগী ধারণা রাখা জরুরি। এও সত্য, প্রচলিত নীতিমালা একেবারেই অপরিবর্তনীয় এমনটি বলা যাবে না। আমাদের অবশ্যই সেগুলো পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তবে আগে পুনর্বিবেচনা করার মতো দক্ষতাও অর্জন করতে হবে। প্রশাসনিক কাঠামো থেকে এজন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তবে যিনি কাজ করবেন তার মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা রাখতে হবে।
একটি মৌলিক সত্য হলো বাস্তবে ভালো নীতি ও খারাপ নীতি বলে কিছু আছে। কিছু নীতি আছে যা কাজ করে আর কিছু আছে করে না। কোন নীতি দেশের জন্য মঙ্গলজনক এটা ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। বরং নিবিড়ভাবে এ নিয়ে পড়ালেখা, গবেষণা, যৌক্তিক বিশ্লেষণ, পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভালো নীতি তৈরি করতে হবে। এজন্য আমাদের উচিত দেশের জন্য সেরা নীতিগুলো খুঁজে বের করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও দক্ষ টিম গঠন করা। সিঙ্গাপুরে এমনটি কোনো বিতর্কিত ধারণা না হলেও বহু দেশে এ কথা আজ বিতর্কিত হয়ে গেছে।
অনেক দেশে গোটা কাঠামো ব্যর্থ হয়েছে এবং একের পর এক সরকার এসেও জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ওসব দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। অনেক জায়গায় মানুষ হতাশ ও তিক্ত। অনেক স্থানে মানুষ বলে, বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রেখেছিলাম কিন্তু তারা আমাদের ব্যর্থ করেছেন। তারা হতাশ হয়ে এও বলেন, এমন বিশেষজ্ঞ ও বিশেষায়িত জ্ঞান যথেষ্ট হয়েছে, এবার এ ‘অভিজাতদের’ তাড়িয়ে দেয়া হোক। এ হতাশার সুযোগ নিয়ে কিছু পপুলিস্ট নেতার উত্থান ঘটে। তারা সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে সরল স্লোগান দেয় এবং যুক্তির বদলে আবেগকে প্রাধান্য দেন। দুর্ভাগ্যবশত এমনটি গোটা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটায়। যেমন অনেক পশ্চিমা দেশে ভ্যাকসিনবিরোধী আন্দোলন বা জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকারের প্রবণতা দেখা গেছে।
সিঙ্গাপুর অবশ্য এমন ট্র্যাজিক পরিস্থিতিতে নেই এবং আমাদের কখনই সেখানে যেতে দেয়া যাবে না। আমরা সিঙ্গাপুরবাসীদের স্পষ্টভাবে এবং সততার সঙ্গে কঠিন বাস্তবতা এবং আমাদের নীতিমালা নির্বাচনের পেছনের যুক্তিগুলো জানাই। সিঙ্গাপুরবাসী বোঝে যে সমস্যার সঠিক সমাধানের পথ আছে এবং ‘নো ফ্রি লাঞ্চ’। অতীতের সাফল্যের জন্যই তারা সরকারের ওপর আস্থাশীল। তারা আস্থা রাখেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও সরকার তাদের পক্ষ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। এ আস্থার চক্র আমাদের টিকিয়ে রাখতে হবে। তবে ভালো নীতি হাওয়া থেকে আসে না। এগুলো তৈরি করতে দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং এমন প্রজ্ঞাবান মন্ত্রী প্রয়োজন, যারা ইস্যুগুলো সম্পর্কে তাদের সচিবদের মতোই জ্ঞান রাখেন এবং উপযুক্ত রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে সক্ষম।
সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয় রাজনীতিতে অংশ নেয়া উচিত নয়। তবে অরাজনৈতিক হওয়া মানে এটি নয় যে তারা দেশের গন্তব্য সম্পর্কে উদাসীন থাকবেন। কর্মকর্তাদের কাজ শুধু মন্ত্রীর আদেশ পালন নয়। কর্মকর্তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতাদের কাছে সাহসী সুপারিশ পেশ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। কোনো নীতি গ্রহণ বা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আপনাদের উদাসীন হলে চলবে না। ‘ইয়েস মিনিস্টার’ টিভি সিরিজের মতো দৃষ্টিভঙ্গি রাখলে চলবে না। মন্ত্রীদের আসা-যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নীতির পরিবর্তন আনা যাবে না।
সৌভাগ্যের বিষয় গত ৬০ বছর আমরা সিঙ্গাপুরে স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছি। আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ অথচ সঠিক পেশাদার সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের ভালো টিমওয়ার্কের কারণে এতদিন আমরা সিঙ্গাপুরে ভালো নীতি বাস্তবায়ন ও সরকারে সুশাসন নিশ্চিত করতে পেরেছি। এটিই আমাদের সাফল্যের অন্যতম কারণ। পাবলিক পলিসিতে ব্যষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে ‘সিঙ্গাপুর ইকোনমিক রিভিউ’ জার্নালে সম্প্রতি আমার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
এতে আমি দেখিয়েছি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কীভাবে আমরা অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বাজারের বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগিয়েছি। আমি কিছু উদাহরণ টেনেছি; যেমন গৃহায়ন ও গণপূর্ত (পাবলিক হাউজিং), ক্যাসিনো এন্ট্রি লেভি, পিইউবি পানির মূল্য নির্ধারণ, জিএসটি ট্যাক্স ও জিএসটি ভাউচার্স। এ নিবন্ধের মূল সুর ছিল এটা, সুনীতি বলতে কিছু একটা আছে এবং সে ধরনের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সরকারেরই কাজ। সরকার যদি ভালো নীতির জন্য রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে না পারে, তবে সেরা আইডিয়াগুলো কেবল আইডিয়াই থেকে যায়। বিশ্বের অনেক দেশই এ ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে। লুক্সেমবার্গের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জ্যঁ ক্লোদ ইয়ুঙ্কার (পরবর্তীতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট) বলেছিলেন, ‘কী করতে হবে এটা আমরা সবাই জানি কিন্তু তা করার পর কীভাবে পুনর্নির্বাচিত হতে পারি সেটা জানি না।’ সিঙ্গাপুর এখন পর্যন্ত এ ‘ইয়ুঙ্কারস ডিলেমা’ এড়াতে সক্ষম হয়েছে।
গত ৬০ বছর আমরা একটি অনুকূল বৈশ্বিক পরিবেশে ছিলাম। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে মোটামুটি স্থিতিশীল ও নীতিভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল। সিঙ্গাপুর এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না যে পরবর্তী ৬০ বছর অতীতের মতো হবে। পৃথিবী মৌলিকভাবে বদলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্বকে অস্থির করে তুলছে। দেশগুলো এখন জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক দক্ষতার ওপরে রাখছে। এতে বিশ্বজুড়ে সহযোগিতা কমে আসবে এবং জীবন অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।
সিঙ্গাপুরের মতো একটি ছোট দেশের জন্য এ পরিবর্তিত পরিবেশে সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতি নিশ্চিত করা অনেক কঠিন হবে। সফলতার এ চক্রটি বা ‘ভার্চুয়াস সাইকেল’ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আমাদের এটি সচল রাখতে আরো পরিশ্রম করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক নেতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর সম্মিলিত মেধা ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। জনগণের আস্থা এবং সামাজিক সংহতিকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তবেই আমরা সিঙ্গাপুরকে একটি ব্যতিক্রমী, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে পারব। তবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে মূল ভূমিকা রাখতে হবে।
- লি সিয়েন লুং: সিঙ্গাপুরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সূত্র: বণিক বার্তা

