‘পার্লামেন্টের সেকেন্ড মোস্ট জুনিয়র’ সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) এমপিদের জন্য সরকারি গাড়ির ব্যবস্থা করার দাবি তোলার পর বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের এই বক্তব্যের প্রতি এক ধরনের সমর্থন জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান মন্তব্য করেন, ‘ছোটদের আবদারে’ সব সময় ‘হ্যাঁ’ বলতে হয়। এই মন্তব্যের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। এরপর রাজনৈতিক অঙ্গন ও আমলাদের একাংশ বিষয়টি তুলনা করছেন দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে। বিশেষ করে মনোরেল প্রকল্প ও এমপিদের জন্য গাড়ি কেনার সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত প্রস্তাবিত মনোরেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ি কেনা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে হিসাব দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭৮৩ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, নতুন সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় মনোরেল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এমপিদের সুবিধা সংক্রান্ত ব্যয়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মনোরেল চালুর কথা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগেই বলেছিলেন বলে আলোচনা রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এই মনোরেলকে মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন বলে জানা যায়। অন্যদিকে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাতিল করে গত রবিবার সংসদে একটি বিল পাস হয়েছে।
চট্টগ্রামে সাড়ে ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। সেই হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৫৯ কোটি টাকা। এছাড়া মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত প্রায় ১.৬ কিলোমিটার দূরত্বে মনোরেল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩৪ কোটি টাকা বলে হিসাব করা হচ্ছে।
এদিকে সাবেক একটি সরকারি উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে আমলাদের কেউ কেউ বলেন, পূর্বে ২৮০টি গাড়ি কেনার জন্য প্রায় ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা ছিল, যেখানে প্রতিটি গাড়ির গড় মূল্য ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পরে সেই উদ্যোগ স্থগিত হয়। এই ভিত্তিতে সংসদ সদস্যদের জন্য সম্ভাব্য গাড়ি ব্যয় হিসাব করা হচ্ছে। সংসদে মোট ৩৫০ জন সদস্য (৩০০ সাধারণ ও ৫০ সংরক্ষিত) ধরে ৪০০টি গাড়ি কেনার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে। এতে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬৩৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গাড়ি কেনা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হবে রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, নিরাপত্তা, গ্যারেজ, চালক ও প্রশাসনিক ব্যয়। এতে পুরো কাঠামো একটি ছোট মন্ত্রণালয়ের সমান ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হতে পারে। সংসদ সচিবালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, গাড়ি থাকলে তার রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে আলাদা পরিবহন পুল গঠন করতে হবে বলেও তিনি মত দেন।
বর্তমানে একজন সংসদ সদস্য মাসে ৭০ হাজার টাকা পরিবহন ভাতা পান। সেই হিসাবে ৩৫০ জন এমপির জন্য পাঁচ বছরে শুধু এই খাতে ব্যয় হতে পারে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণসহ মোট ব্যয় প্রায় ৭৮৩ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে বিভিন্ন মহল হিসাব দিচ্ছে।
এই আলোচনার মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে গাড়ি থাকলেও সংসদ সদস্যদের জন্য এমন ব্যবস্থা নেই। তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি চাননি বলেও স্পষ্ট করেন। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানও সংসদে সমর্থনের ইঙ্গিত দেন বলে আলোচনা রয়েছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে তাদের দল থেকে কেউ এমপি হলে তারা সরকারি প্লট বা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না।
পরে সমালোচনার মুখে হাসনাত আবদুল্লাহ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লটের পক্ষে নন, বরং সরকারি কর্মকর্তাদের মতো প্রক্রিয়ায় এমপিদেরও গাড়ি দেওয়ার কথা বলেছেন। এদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি সংকট, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, লোডশেডিং এবং সরকারি সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।

