বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, টাকার মান কমে যাওয়া, জ্বালানি আমদানিতে বিলম্ব, শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁরা আরও সতর্ক হয়ে উঠছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) এর ‘ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এফডিআই মজুত ছিল ১৮.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামে ছিল ২৪৯.১৪ বিলিয়ন ডলার, কম্বোডিয়ায় ৫২.৬৭ বিলিয়ন ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৩০৫.৬৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম প্রায় ১৩ গুণ, ইন্দোনেশিয়া প্রায় ১৭ গুণ এবং কম্বোডিয়া প্রায় ৩ গুণ এগিয়ে রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এলেও ২০২৪ সালে তা কমে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। একই সময়ে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে দাঁড়ায়। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়। এসব সূচক বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক পরিবেশ উন্নত হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশও করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন, একীভূত আইন কাঠামো তৈরি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার এবং সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে আঙ্কটাডের ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজ বিভাগের পরিচালক ন্যান লি কলিন্স ভিডিও বার্তায় বক্তব্য দেন। সংস্থাটির লিগ্যাল অফিসার কিয়োশি আদাচি মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াইস পারারির সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সমন্বয় বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বাভাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন অগ্রাধিকার।

