বিশ্ব বর্তমানে এক কঠিন ও অনিশ্চিত সময় পার করছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তার মতে, বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে অস্থির অবস্থায় রয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে।
গতকাল সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ভবনে আয়োজিত ‘আঙ্কটাড ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে এখন ‘গিয়ার শিফট’ করার সময় এসেছে। তার ভাষায়, “আমরা অনেক পরিকল্পনা করি, সুন্দর সুন্দর রিপোর্ট তৈরি হয়, সেগুলোর সঙ্গে আমরা একমতও হই। কিন্তু বাস্তবে সেই সুপারিশগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয় না।” তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় প্রতিযোগী দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ফলে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এর ফলে জ্বালানি সংকট ও পণ্য পরিবহনে অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির বাইরে নয়। তাই বৈশ্বিক এই অস্থিরতার মধ্যেও বিদ্যমান বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখা এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
আশিক চৌধুরী জানান, স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগোলেও বিনিয়োগ সূচকে সেই অগ্রগতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) ও মোট বিনিয়োগের হার দীর্ঘদিন ধরে প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে, যা উদ্বেগের বিষয়।
তিনি এ প্রসঙ্গে নেদারল্যান্ডসের একটি ফুটবল দলের উদাহরণ টেনে বলেন, ভালো খেলা সত্ত্বেও সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না—বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিও অনেকটা সেই রকম।
তার মতে, দেশে পরিকল্পনার ঘাটতি নয়, মূল সমস্যা বাস্তবায়নের। “এই চক্র ভাঙতে হবে,” বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন সংস্কারের দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশের সময় এসেছে, যেখানে উদ্দেশ্যনির্ভর পরিকল্পনা, শক্তিশালী বাস্তবায়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আগামী দুই থেকে তিন বছরে গত পাঁচ বছরের সমান অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুত অগ্রগতি ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হবে।
বিডার বাজেট প্রস্তাবনা:
আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে বিডা একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্ক্যালোপ আমদানির শুল্ক ৩৩.৬৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা। সংস্থাটি জানায়, ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশে এ ধরনের শুল্ক শূন্য শতাংশ। তাই উচ্চ শুল্ক বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিডার মতে, জাপানি প্রতিষ্ঠান জে গ্রুপ ইতোমধ্যে বাংলাদেশে স্ক্যালোপ প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং পাইলট প্রকল্পে ১৬০ মেট্রিক টন স্ক্যালোপ আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করেছে।
শুল্ক কমানো হলে মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে বিডা। পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। স্ক্যালোপ হলো সামুদ্রিক ঝিনুকজাতীয় একটি প্রাণী, যার ভেতরের সাদা পেশিবহুল অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এটি ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ।
বিডা লিথিয়াম ব্যাটারির পাশাপাশি সোডিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন ও সংযোজনকারীদের বিশেষ ভ্যাট সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। স্থানীয় মূল্য সংযোজনের ভিত্তিতে ২ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াতি ভ্যাটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যবহৃত রাউটার ও সুইচসহ বিভিন্ন পণ্যে কর কমানোর প্রস্তাব এসেছে। পেশেন্ট মনিটরের মতো চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতেও করছাড় চাওয়া হয়েছে।
রপ্তানিমুখী আংশিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বার্ষিক উৎপাদনের ২০ শতাংশ পর্যন্ত কাঁচামাল ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিডা। এছাড়া রপ্তানি পণ্যে ন্যূনতম মূল্য সংযোজন হার ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ে। একই সঙ্গে একাধিক ক্রেতার জন্য বারবার সহগ অনুমোদনের জটিলতা কমিয়ে একবার অনুমোদিত সহগ ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
বিডার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশকে বিনিয়োগে গতি বাড়াতে হবে। পরিকল্পনা নয়, এখন প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন—এমনটাই জোর দিয়ে বলেছেন সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তা।

