দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবে সেই বিদ্যুৎ সঠিকভাবে সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ফলে লোডশেডিং, শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সংকট এবং বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ মিলিয়ে পুরো বিদ্যুৎ খাত এখনো অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় নীরবে দ্রুত বিস্তার ঘটছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের। শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এখন এসব যানবাহনের উপস্থিতি চোখে পড়ছে সর্বত্র। স্বল্প খরচে চলাচলের সুযোগ তৈরি করায় সাধারণ মানুষের কাছে এগুলোর জনপ্রিয়তাও বাড়ছে দ্রুত।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিস্তারের পেছনে তৈরি হচ্ছে নতুন এক চাপ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে ব্যাটারিচালিত যানগুলো। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্রিড, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিদ্যুতের বড় অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ও অদক্ষ পদ্ধতিতে।
বিশেষ করে পুরোনো প্রযুক্তির ব্যাটারি, নিম্নমানের চার্জিং ব্যবস্থা এবং অবৈধ সংযোগের কারণে বিদ্যুতের অপচয় বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম না মেনে আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে যানবাহনগুলোতে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান এখন দেশের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে কিন্তু পরিকল্পনাহীন সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই এই খাতকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহার ও সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় আনার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ব্যাটারিচালিত যানেই প্রতিদিন কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যয়:
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যানের সংখ্যা ঠিক কত, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব এখনো নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এক কোটিরও বেশি ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করছে। এর বড় একটি অংশ অনিবন্ধিত হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ভ্যান দৈনিক গড়ে ৪ থেকে ৬ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সে হিসাবে যদি অন্তত ৮০ লাখ যান সক্রিয় থাকে, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৪ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধু এই খাতেই। বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিমাণ বিদ্যুৎ একটি বড় আকারের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৈনিক উৎপাদনের সমান। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এর বড় অংশই আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কেন ‘অদৃশ্য’ থেকে যাচ্ছে বিদ্যুৎ ব্যবহার:
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর ভাষ্য, ব্যাটারিচালিত যান খাতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রকৃত হিসাব নির্ধারণ করা কঠিন কয়েকটি কারণে। বেশিরভাগ যান চার্জ দেওয়া হয় বাসাবাড়ি, ছোট গ্যারেজ বা অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্টে। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয় অবৈধ সংযোগ। এ ছাড়া এই খাতের জন্য আলাদা মিটারিং ব্যবস্থা বা নির্দিষ্ট ট্যারিফ না থাকায় বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎও গৃহস্থালি সংযোগের আওতায় চলে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার, রাজস্ব ক্ষতি এবং আর্থিক প্রভাবের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
বছরে ব্যয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি:
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান রয়েছে। এসব যান চালাতে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় প্রায় ৩২ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ দশমিক ৭ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। এই বিপুল বিদ্যুতের আর্থিক মূল্যও কম নয়। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এই খাতে ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি টাকা। বছরে সেই অঙ্ক ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কারণ ব্যবহৃত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ অপচয়, সিস্টেম লস কিংবা সরাসরি চুরির মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্যে দেখা গেছে, শুধু রাজধানীতেই বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ চুরি হয়। আর সারা দেশে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বেশি হতে পারে। ফলে ব্যাটারিচালিত যান শুধু বিদ্যুতের বড় ভোক্তাই নয়, অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও অবৈধ সংযোগের কারণে বিদ্যুৎ খাতের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপও তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন নগর ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে যেগুলোকে অনেকে ব্যঙ্গ করে ‘বাংলা টেসলা’ বলে ডাকছেন, সেই যানগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল এক চার্জিং ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের নেটওয়ার্ক। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এই অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিং ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ সরাসরি বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে যুক্ত।
কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতির মধ্যে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় আনুমানিক ১০ লাখের বেশি এ ধরনের যান চলাচল করছে বলে ধারণা করা হয়। তবে নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় এগুলো কার্যত অননুমোদিতভাবে চলছে। ফলে একদিকে যেমন যাত্রী চলাচল সহজ হয়েছে, অন্যদিকে নগর ব্যবস্থাপনা ও সড়ক শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে রাজধানীতে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) আওতায় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ১০০টি স্টেশন। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যার বাইরে গড়ে উঠেছে বড় একটি অবৈধ নেটওয়ার্ক। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং প্রায় এক হাজার গ্যারেজে নিয়মিত ব্যাটারি চার্জিং চলছে। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ সংযোগ থাকলেও তার আড়ালে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মিরপুর, রূপনগর, পল্লবী, তেজগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও ও লালবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য অননুমোদিত চার্জিং কেন্দ্র। কিছু ক্ষেত্রে স্ট্রিটলাইটের খুঁটি কিংবা সরাসরি মূল বিদ্যুৎ লাইনের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে এসব যানবাহনের ব্যাটারি।
গ্যারেজ মালিক ও শ্রমিকদের তথ্য অনুযায়ী, একটি রিকশা চার্জ দিতে খরচ হয় ৭০ থেকে ১০০ টাকা। তবে যাত্রী বা চালকের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। দৈনিক হাজার হাজার টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখানো হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বেশি রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত হিসাব আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এ খাত এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অনেক আবাসিক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ হিসেবে ভাড়া দিয়ে বাড়তি আয় করছেন মালিকরা। এতে আবাসিক এলাকা ধীরে ধীরে চার্জিং হাবে পরিণত হচ্ছে।
ঢাকায় কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয়:
বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পির মতে, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৮৬ হাজার তিন চাকার রিকশা বিদ্যুতে চলছে। তিনি জানান, প্রতিটি রিকশা দৈনিক গড়ে দুইবার চার্জ নেয় এবং প্রতিবার ব্যয় হয় প্রায় ৮০ টাকা। সে হিসাবে একটি রিকশার দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৬০ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে।
জাতীয়ভাবে চিত্র আরও বড়। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান রয়েছে।একই হারে হিসাব করলে, এসব যানবাহনের দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে আসে। ফলে এই বিদ্যুৎ সড়ক পরিবহনে ব্যবহারের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জ্বালানি অপচয় বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন জাতীয় জ্বালানি দক্ষতা কমছে, অন্যদিকে অর্থনীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
স্পষ্ট নীতিমালার অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। তাই ব্যাটারিচালিত যান নিয়ন্ত্রণ, চার্জিং ব্যবস্থার শৃঙ্খলা আনা এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানবাহনের প্রকৃত চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বড় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে দেশে নিবন্ধিত তিন চাকার যানবাহনের সংখ্যা মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা ও খাত-সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুযায়ী, দেশে ৬০ থেকে ৭০ লাখ অনিবন্ধিত যান চলাচল করছে। সব মিলিয়ে প্রকৃত সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি হতে পারে।
এই বিশাল অংশ এখন কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে নেই। ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে, তেমনি সরকারের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হচ্ছে। নীতিগত নজরদারি দুর্বল থাকায় পুরো একটি বড় পরিবহন খাত কার্যত আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গ্রামীণ ও উপশহর এলাকায় এসব অনিবন্ধিত তিন চাকার যান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো আইনগত কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হচ্ছে।
এই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে বিদ্যুৎ খাতে বাড়ছে চাপ, বাড়ছে অবৈধ সংযোগের ঝুঁকিও। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিশ্বজুড়েই বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের ব্যবহার বাড়ছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এসব যানবাহনের বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি বড় অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে হচ্ছে।
তার মতে, অবৈধ লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে সিস্টেম লস বাড়ছে এবং সরকারের ভর্তুকির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। যত্রতত্র সংযোগ বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করছে।
লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অভাব:
ড. তৌফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, দেশে চলাচলরত বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক যানবাহনেরই নেই বৈধ লাইসেন্স, রোড পারমিট বা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। অনেক চালকই প্রশিক্ষণ ছাড়াই এসব যান সড়কে চালাচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে টেকসই ও বিকল্প জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি। এতে একদিকে বিদ্যুৎ খাতের চাপ কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর সহজ হবে।
শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অনুরূপ তিন চাকার যান ঘিরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ৮৬ হাজার বৈদ্যুতিক রিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি রিকশায় দৈনিক গড়ে ১৬০ টাকার বিদ্যুৎ খরচ ধরলে রাজধানীতেই প্রতিদিন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১.৩৭ কোটি টাকা। এই হিসাব শুধু রাজধানীর চিত্র। সারা দেশে যদি প্রায় ১ কোটি ব্যাটারিচালিত যান ধরা হয়, তাহলে দৈনিক বিদ্যুৎ ব্যয়ের পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়, যা জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চার্জিং হচ্ছে বাসাবাড়ি ও ছোট গ্যারেজে। অনেক জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ সংযোগ। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গৃহস্থালি সংযোগ দিয়েই বাণিজ্যিকভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে, আলাদা মিটারিং বা নির্দিষ্ট ট্যারিফ ব্যবস্থা নেই। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার ও আর্থিক ক্ষতির সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। কোথাও কোথাও সরাসরি বিদ্যুৎ লাইনে হুকিং করে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত রিকশা রাতে চার্জ দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় ট্রান্সফরমারে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, ভোল্টেজ কমে যায় এবং অনেক এলাকায় লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিদ্যুৎ প্রকৌশলীরা এই পরিস্থিতিকে ‘অদৃশ্য লোড’ হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন, এটি এখন গ্রিড ব্যবস্থাপনার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে ব্যবহৃত বেশিরভাগ যানবাহনে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি ও নিম্নমানের চার্জার ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের একটি বড় অংশ তাপে অপচয় হয়, ব্যাটারির স্থায়িত্ব কমে যায় এবং একই দূরত্বে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে মোট বিদ্যুৎ খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ তেলনির্ভর কেন্দ্র থেকে আসে। ফলে তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সেই বিদ্যুৎ দিয়ে যানবাহন চালানো—এই দ্বৈত প্রক্রিয়ায় জ্বালানি দক্ষতা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত সিসা দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও গ্যারেজ-ঘন এলাকায় শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মস্তিষ্কের বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ভর্তুকির কারণে এই বিপুল ব্যবহার পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, শিল্প খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ এবং উৎপাদনশীল খাতে প্রভাব পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কম উৎপাদনশীল খাতে বিদ্যুতের এই ব্যবহার সামগ্রিক অর্থনৈতিক দক্ষতাকে দুর্বল করছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। তবে জ্বালানি ঘাটতির কারণে প্রায়ই ২৫০০ থেকে ৩০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এই সংকটের মধ্যেই ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সব চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এই খাতের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। যেমন—স্বল্প আয়ের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি, শহর ও গ্রামে লাস্ট-মাইল সংযোগ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই খাত নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে সুশৃঙ্খল নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন।
এই খাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্পষ্ট নীতিমালার অভাব। পরিবহন আইনে পরিষ্কার অবস্থান না থাকা, বিদ্যুৎ ব্যবহারে আলাদা নীতি না থাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে একটি ‘গ্রে এরিয়া’ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বিদ্যুৎ ব্যয় এবং বিপুল অপচয়—এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, এখনই সঠিক নীতিমালা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এই খাতকে ঝুঁকি থেকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। না হলে ভবিষ্যতে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সিভি/এম

