উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্দিষ্ট আয়ের উৎস খুঁজছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ঝুঁকিমুক্ত কোনো খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে সামনে এসেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্র।
সরকারি এই বিনিয়োগ পদ্ধতি এখন অনেকের কাছেই স্থিতিশীল আয়ের ভরসা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে সুদের হার তুলনামূলক কম থাকায় সঞ্চয়পত্রে ঝোঁক বাড়ছে।
সঞ্চয়পত্রের ধরন কী কী:
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু আছে। এগুলো হলো—পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এবং তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। এর মধ্যে পরিবার সঞ্চয়পত্র ছাড়া বাকি তিনটি সঞ্চয়পত্রে ব্যক্তি ছাড়াও প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে পারে।
মুনাফার হার কত:
সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে সাধারণত ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়। এই হার অনেক ব্যাংকের গড় সুদের হারের চেয়ে বেশি, যেখানে ব্যাংকগুলোর সুদের হার সাধারণত ১০ শতাংশের নিচে থাকে।
কেন সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন মানুষ:
১. মূলধন হারানোর ঝুঁকি নেই: সঞ্চয়পত্র সরাসরি সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত বিনিয়োগ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখানে মূলধন ফেরত না পাওয়ার ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে। তাই এটি তুলনামূলক নিরাপদ।
২. তুলনামূলক বেশি মুনাফা: ব্যাংক আমানতের তুলনায় সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার বেশি। যদিও কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশি সুদ দেয়, তবে সেগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন থাকে। সে তুলনায় সঞ্চয়পত্র বেশি আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
৩. নিয়মিত আয় পাওয়া যায়: এখানে মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুনাফা তোলার সুযোগ রয়েছে। যেমন পরিবার সঞ্চয়পত্রে প্রতি মাসেই মুনাফা পাওয়া যায়। ফলে এটি অনেকের জন্য নিয়মিত আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪. সহজ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া: ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে এখন সঞ্চয়পত্র কেনা ও মুনাফা পাওয়া তুলনামূলক সহজ। ঝামেলাও কম।
৫. মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা: গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অনেক পরিবারকে খরচ সামলাতে সাহায্য করছে।
৬. কর কাঠামো সহজ: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নির্ধারিত হারে উৎসে কর কেটে নেয়। ফলে আলাদা হিসাব-নিকাশের জটিলতা কম থাকে।
কত টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করা যায়; সঞ্চয়পত্রে নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে—
- পরিবার সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা (শুধু নারীদের জন্য)
- পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা, যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা
- পেনশনার সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা (সরকারি অবসরপ্রাপ্তদের জন্য)
- তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র: সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা, যৌথ নামে ৬০ লাখ টাকা
বাংলাদেশি নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরাও নির্ধারিত নিয়ম মেনে এতে বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে পরিবার সঞ্চয়পত্র শুধুমাত্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত।

