এটি কেবল আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন করা গেলে এই বিনিয়োগ দেশের ফার্মাসিউটিক্যালস ও বায়োসিকিউরিটি খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সিরাজদিখানকে শুধুমাত্র একটি স্থানান্তরযোগ্য ফাঁকা জমি হিসেবে বিবেচনা করাও হবে সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি। বাস্তবে এটি একটি জাতীয় বায়োসিকিউরিটি ও লাইফ সায়েন্সেস উদ্ভাবনী করিডোর গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে সিরাজদিখান একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত। একদিকে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা রাজধানীকেন্দ্রিক গবেষণা ও জ্ঞানভিত্তিক হাব। অন্যদিকে সাভার অঞ্চলে রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক ইকোসিস্টেম, প্রাণিসম্পদ গবেষণা কেন্দ্র, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি, অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং একাধিক দেশীয় ওষুধ কোম্পানিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য ক্লাস্টার।
পরিকল্পিত মেট্রো সংযোগ এবং এন-৫ ও এন-৮ করিডরের সঙ্গে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা যুক্ত করা গেলে সিরাজদিখান এই দুই বড় জ্ঞান ও শিল্প ক্লাস্টারের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধনের ভূমিকা নিতে পারে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্পকে বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত জ্ঞান ও উৎপাদনভিত্তিক ইকোসিস্টেম হিসেবে বিবেচনা করা। এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা গেলে গবেষক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ল্যাবরেটরি, উৎপাদন লাইন, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে।
এই ধরনের সমন্বিত প্ল্যাটফর্মই একটি দেশকে আমদানিনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা থেকে সরিয়ে প্রকৃত উদ্ভাবনভিত্তিক সক্ষমতার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। সিরাজদিখানকেন্দ্রিক এই করিডোরে শুধু উৎপাদন কারখানা নয়, বরং যৌথ গবেষণাগার, স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার, বিশ্ববিদ্যালয়-সংযুক্ত টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস এবং বিজ্ঞানী ও বায়োইঞ্জিনিয়ার তৈরির জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে।
এখনকার সময়টি বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর ট্রিপস-সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্ব ছাড় সুবিধা শেষ হয়ে যাবে। তখন এই খাতকে আরও কঠোর ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক আইপি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে হবে। বর্তমানে দেশের ওষুধ শিল্প নিজস্ব চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে এবং বহু দেশে জেনেরিক ওষুধ রফতানি করে সুনাম অর্জন করেছে। তবে এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক মেধাস্বত্ব কাঠামোর অনেক শর্তেই তুলনামূলক ছাড় কার্যকর ছিল।
এখনই প্রয়োজনীয় সংস্কার না আনলে এই অর্জন ভবিষ্যতে চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরকে আধুনিক দক্ষ জনবল, সমৃদ্ধ আইপি জ্ঞান এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো দিয়ে পুনর্গঠন করা জরুরি হয়ে উঠেছে। এটি কোনো বিলাসী সংস্কার নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও পরিবর্তনের তাগিদ রয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন নীতিগত ও প্রণোদনামূলক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে, যাতে তারা আইপি ব্যবস্থাপনা, শিল্প–গবেষণা অংশীদারত্ব এবং স্পিন-অফ কোম্পানি গঠনে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি অর্থায়নে গঠিত ফার্মাসিউটিক্যালস কারখানার অবস্থান, উৎপাদন কাঠামো ও লক্ষ্য নির্ধারণ যেন শুধু স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন সুবিধা বা জমির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর না করে। বরং দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং রফতানি কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
‘ওয়ান হেলথ’ ধারণায় মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যকে একক কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই সমন্বিত কাঠামো এখনও পূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) কার্যক্রম সীমাবদ্ধ মূলত মানবস্বাস্থ্যের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে। উন্নত ভ্যাকসিন বা জটিল বায়োলজিক উৎপাদনের সক্ষমতা এখনও সীমিত।
অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ খাতে কিছু প্রাথমিক ভ্যাকসিন উৎপাদন হলেও তা মূলত মহাখালীর প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের পুরনো ও সীমিত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি সমন্বিত অ্যানিমেল হাউজ স্থাপনের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই কেন্দ্র মানব ও প্রাণী উভয় খাতে ভ্যাকসিন, থেরাপিউটিকস ও ডায়াগনস্টিকস উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা।
তবে এই অবকাঠামো কোথায় এবং কীভাবে গড়ে উঠবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নীতিনির্ধারকদের মতে, যদি এই অ্যানিমেল হাউজ পৃথক প্রকল্প হিসেবে পরিচালিত হয় এবং ইডিসিএলের ভিটিডি প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় না থাকে, তবে সম্পদের অপচয় ও গবেষণাগত ফাঁক তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি এটিকে জাতীয় বায়োসিকিউরিটি কাঠামোর অংশ হিসেবে একীভূতভাবে পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি সমন্বিত ‘ওয়ান হেলথ’ ভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারবে। সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে দেশটি ওষুধ উদ্ভাবন, বায়োমেডিকেল গবেষণা এবং উন্নত রোগনির্ণয় ও নিরাপত্তা পরীক্ষণের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। এই প্রকল্পগুলোকে এখন আর আলাদা উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোকে একত্রে সমন্বয় করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশের সরকারি খাতে বড় প্রকল্প কীভাবে নকশা ও বাস্তবায়ন হয়, সেই প্রক্রিয়াটিও নতুন করে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ছোট ও মাঝারি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে তুলনামূলক অগ্রগতি থাকলেও লাইফ সায়েন্সভিত্তিক বড় ও জটিল প্রকল্পে ভিন্ন ধরনের শাসন কাঠামো ও নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান জ্যেষ্ঠ আমলা বা চিকিৎসকরা, যারা তাদের মূল দায়িত্বের পাশাপাশি এসব বহুমাত্রিক প্রকল্প পরিচালনা করেন। কিন্তু বড় প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় যে ধরনের পেশাদার দক্ষতা, প্রযুক্তিগত গভীরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা প্রয়োজন, তা অনেক সময় পর্যাপ্তভাবে থাকে না। ফলে প্রকল্পে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় জটিলতা এবং কারিগরি সিদ্ধান্তে ভুলের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে একটি নতুন নেতৃত্ব মডেলের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এমন একটি কাঠামো, যেখানে নীতিগত দিকনির্দেশনা, প্রশাসনিক ক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং বাস্তবায়ন শৃঙ্খলা একসঙ্গে কাজ করবে। পূর্ববর্তী কিছু জটিল প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি ‘ত্রয়ী’ কাঠামোর ধারণা কার্যকর হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এই কাঠামোতে— একজন জ্যেষ্ঠ আমলা থাকবেন, যিনি জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে প্রকল্পের সামঞ্জস্য ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নিশ্চিত করবেন। একজন দক্ষ টেকনোক্র্যাট থাকবেন, যিনি বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড বজায় রাখবেন। এবং একজন বেসরকারি খাত বা করপোরেট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পেশাদার থাকবেন, যিনি সময়, ব্যয় ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবেন। এই সমন্বিত নেতৃত্ব কাঠামো প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে পারে।
এই বিষয়টি শুধু কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশ এখন এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, শিল্পনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। আগামী কয়েক বছরে নেওয়া সিদ্ধান্ত—কোন স্থানে কোন অবকাঠামো গড়ে উঠবে, কোন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কতটা বিস্তৃত হবে, মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং প্রকল্প নেতৃত্বের কাঠামো কেমন হবে—এসবই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি। এগুলোই ঠিক করবে, ভবিষ্যৎ কোনো মহামারিতে বাংলাদেশ কতটা সক্ষমভাবে সাড়া দিতে পারবে এবং বৈশ্বিক ভ্যাকসিন ও ওষুধ মূল্যশৃঙ্খলে দেশের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে।
যদি সিরাজদিখানকে একটি ইনোভেশন করিডোরের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায় এবং এর সঙ্গে আধুনিক মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাপনা, ‘ওয়ান হেলথ’ভিত্তিক গবেষণা সক্ষমতা এবং পেশাদার নেতৃত্ব কাঠামো একীভূত করা যায়, তবে একটি সুসংহত জাতীয় বায়োসিকিউরিটি ও লাইফ সায়েন্সেস কৌশল গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু নিজের স্বাস্থ্য নিরাপত্তাই শক্তিশালী করবে না, বরং আঞ্চলিক লাইফ সায়েন্সেস খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের অবস্থান অর্জন করতে পারবে।
সিভি/এম