প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নতুন কোনো কর আরোপ করা হয়নি। একই সঙ্গে কালোটাকা বৈধ করার কোনো সুযোগও রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
গত শনিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘অর্থ বিল ২০২৬-২৭-এর বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত অর্থ বিলের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সঞ্চয়পত্র সংক্রান্ত নতুন ব্যবস্থার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এনবিআরের প্রথম সচিব (কর তথ্য ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়ন) মো. জাফর ইমাম বলেন, আগে সঞ্চয়পত্রের আয়ের বিপরীতে কাটা কর ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য হতো। ফলে এই অর্থ অন্য কোনো আয়ের করের সঙ্গে সমন্বয় করা যেত না। করদাতারা সেই অর্থ ফেরতও পেতেন না। নতুন ব্যবস্থায় এই করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা হবে, ফলে করদাতারা প্রকৃত সুবিধা পাবেন।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি ৫০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে বছরে ৫ লাখ টাকা সুদ পান, তাহলে ৫ শতাংশ হারে তার ২৫ হাজার টাকা কর কাটা হবে। কিন্তু করমুক্ত আয়ের সীমা বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত করের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১৫ হাজার টাকা। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাটা ১০ হাজার টাকা ফেরত পাওয়া যাবে অথবা অন্য করের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে।
রিফান্ড প্রক্রিয়া সম্পর্কে জাফর ইমাম জানান, আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় যদি সিস্টেম অতিরিক্ত কর শনাক্ত করে, তাহলে করদাতার ব্যাংক হিসাবের তথ্য নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় যাচাই ও নিরীক্ষা শেষে ১২০ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত পাঠানো হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর করহার বাড়ানো হয়নি। বরং যেসব করদাতার একমাত্র আয় সঞ্চয়পত্র থেকে আসে, তারা নতুন ব্যবস্থার কারণে উপকৃত হবেন। স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেকেই অতিরিক্ত কাটা অর্থ ফেরত পাবেন।
তিনি আরও বলেন, হিসাব-নিকাশ করে দেখা গেছে নতুন নিয়মে অধিকাংশ করদাতার করের বোঝা কমবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির যদি সঞ্চয়পত্র থেকে বছরে ৫ লাখ টাকা সুদ, চাকরি থেকে ১০ লাখ টাকা এবং বাড়িভাড়া থেকে আরও ১০ লাখ টাকা আয় থাকে, তাহলে আগের নিয়মে সঞ্চয়পত্রের কর অন্য আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যেত না। ফলে মোট করের পরিমাণ বেশি হতো। নতুন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে কাটা কর মোট কর দায়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে, যা করদাতার মোট পরিশোধযোগ্য কর কমিয়ে দেবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, যাদের আয় বেশি এবং বিভিন্ন উৎস থেকে আয় আসে, তাদের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ বাড়তে পারে। কারণ সঞ্চয়পত্রে কাটা ১০ শতাংশ কর যদি তাদের প্রকৃত করহারের চেয়ে কম হয়, তাহলে বাকি কর পরিশোধ করতে হবে। অনেকের ক্ষেত্রে এই করহার ২০, ২৫ বা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
সেমিনারে কালোটাকা বৈধ করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। কালোটাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখার ইচ্ছা নেই এবং প্রস্তাবিত বাজেটেও এ ধরনের কোনো বিধান সংযোজন করা হয়নি। তিনি জানান, অতীতে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে আয়ের উৎস না দেখিয়েও ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের সুযোগ ছিল। তবে সেই ব্যবস্থা এখন আর বহাল নেই। বর্তমান সরকার শুরু থেকেই কালোটাকা বৈধ করার নীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মূল্য কম দেখানোর কারণে যে জটিলতা তৈরি হয়, সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে আগের বছরই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ যদি প্রকৃত দামে সম্পত্তি বিক্রি করে নিয়মিত হারে কর পরিশোধ করেন, তাহলে অতিরিক্ত কোনো বিশেষ বিধানের প্রয়োজন হবে না। এ কারণে চলতি অর্থ বিলে নতুন করে এ বিষয়ে কোনো বিধান আনা হয়নি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাসেম। এছাড়া এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (মূসক) বদরউদ্দিন মুন্সী, কাস্টমস নীতির প্রথম সচিব তারেক হাসান এবং হিসাববিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

