বিয়ের ঋণে কোন ব্যাংক কত দিচ্ছে:
বিয়ের খরচ মেটাতে এখন দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় বিবাহ ঋণ দিচ্ছে। তবে ব্যাংভেদে ঋণের পরিমাণ, সুদের কাঠামো ও শর্তে রয়েছে ভিন্নতা।
তুলনামূলকভাবে বেশি ঋণ সুবিধা দিচ্ছে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক। ব্যাংকটি ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় এক লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেয়। এই সুবিধা চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী এবং জমির মালিকরা নিতে পারেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে মাসিক আয় কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা এবং অন্য আবেদনকারীদের জন্য অন্তত ৪০ হাজার টাকা আয় থাকতে হয়।
অন্যদিকে উত্তরা ব্যাংক তুলনামূলক ছোট পরিসরে ঋণ দিয়ে থাকে। এখানে ২৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়। এই ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) ব্যক্তিগত ঋণের অংশ হিসেবে ২ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিয়ের ঋণ দেয়। ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)–ও বিয়ের খরচের জন্য ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। এই ব্যাংকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায় এবং পরিশোধের সময়সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলো মূলত ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় বিবাহ ঋণ দিয়ে থাকলেও পরিমাণ ও শর্তে পার্থক্য রয়েছে, যা গ্রাহকের আয় ও পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
কারা পাবেন না বিবাহ ঋণ:
বিয়ের খরচ মেটাতে ব্যাংকের দেওয়া বিবাহ ঋণ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ না হলে এই সুবিধা পাওয়া যায় না। যাদের নিয়মিত ও পর্যাপ্ত আয় নেই, অস্থায়ী চাকরি বা অনিশ্চিত পেশায় যুক্ত, চাকরির অভিজ্ঞতা কম, বয়স নির্ধারিত সীমার বাইরে কিংবা ব্যাংকে লেনদেনের ইতিহাস দুর্বল—তাদের ক্ষেত্রে বিবাহ ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
এছাড়া মাসিক আয়ের তুলনায় ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা না থাকলে ব্যাংক সাধারণত আবেদন অনুমোদন করে না। ঋণ খেলাপি থাকা, দুর্বল ক্রেডিট রেকর্ড বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকলেও আবেদন বাতিল হতে পারে।
কারা এই ঋণ নিতে পারেন:
বিবাহ ঋণ সাধারণত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য, যাদের বয়স ২১ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে এবং যারা চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী। আয় ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কেউ নিজের পাশাপাশি সন্তান বা ভাই-বোনের বিয়ের জন্যও এই ঋণ নিতে পারেন।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্ত প্রযোজ্য। কর্মরত সদস্যদের বয়স হতে হবে ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। তবে কোনো সদস্য তার সন্তানের বিয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫৬ বছর বয়স পর্যন্ত এই সুবিধা নিতে পারেন। ঋণ পরিশোধের সময়সীমা সাধারণত ১ থেকে ৫ বছর।
আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
বিবাহ ঋণের জন্য আবেদন করতে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের কপি, সদ্য তোলা দুই কপি ছবি এবং চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন স্লিপ বা সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স জমা দিতে হয়। পাশাপাশি গত ৬ থেকে ১২ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্টও চাওয়া হতে পারে।
বাড়ি সাজানো বা আসবাব কেনার উদ্দেশ্যে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে কিছু ব্যাংক অনাপত্তি সনদ (এনওসি)ও চাইতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঋণ সরাসরি বিবাহ ঋণ হিসেবে না দিয়ে ব্যক্তিগত ঋণের আওতায় দেওয়া হয়, যা পরে বিয়ের খরচে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিবাহ ঋণের পরিমাণ ও গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে এ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সময়ে হিসাবধারীর সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৩৪ জনে, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৪১৫ জন বেশি। ২০২৪ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৬২ জন। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর থেকে এই খাতে ঋণ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ঋণের পরিমাণ ও ব্যবহারকারী উভয়ই বাড়ছে।
ব্যাংকারদের মতে, বিবাহ ঋণ মূলত রিটেইল বা ব্যক্তিগত ঋণের অংশ হিসেবে দেওয়া হয়। কিছু ব্যাংক সরাসরি ‘ম্যারেজ লোন’ নামে ঋণ দিলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এটিকে গৃহসজ্জা বা ব্যক্তিগত ঋণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) এক কর্মকর্তা জানান, অনেক গ্রাহক সরাসরি বিবাহ ঋণের বদলে ব্যক্তিগত ঋণ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং সেই অর্থ দিয়েই বিয়ের খরচ মেটান।
সীমান্ত ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিজিবি সদস্যদের জন্য বিশেষ বিবাহ ঋণ সুবিধা রয়েছে। তারা ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। এমনকি সন্তানের বিয়ের ক্ষেত্রেও এই সুবিধা প্রযোজ্য।
বিবাহ ঋণ সম্প্রসারণের দাবি অর্থনীতিবিদদের:
বিবাহ ঋণ সুবিধা আরও বিস্তৃত করার পক্ষে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এটি শুধু আর্থিক চাপ কমায় না, বরং ব্যাংকিং খাতে গ্রাহকের আস্থাও বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংক বর্তমানে ‘বিবাহ লোন’ বা ব্যক্তিগত ঋণের একটি অংশ হিসেবে এই সুবিধা দিচ্ছে। এটি মূলত ভোক্তা ঋণের অন্তর্ভুক্ত। তবে নির্দেশনা থাকলেও সব ব্যাংক এখনো এ খাতে সক্রিয় হয়নি। তিনি আরও জানান, বিবাহ ঋণ সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি তুলনামূলক নিরাপদ। পাশাপাশি এতে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও কম থাকে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, বিবাহ ঋণের মতো নতুন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে গ্রাহকের আস্থা বাড়ার পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও সম্প্রসারিত হবে। তার মতে, খেলাপি ঝুঁকি কম থাকলে আরও ব্যাংকের এ খাতে এগিয়ে আসা উচিত।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ঋণ যেন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। না হলে এই সুবিধার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
সিভি/এম