আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি জোরালোভাবে উঠছে কিন্তু এই বৈশ্বিক আলোচনার ভেতরেই বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিন টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। গত তিন থেকে পাঁচ বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং যাতায়াত ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অথচ সেই তুলনায় বাড়েনি শ্রমিকদের আয়। ফলে কঠোর পরিশ্রম করেও মাস শেষে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের হিসাব মিলছে না অনেকেরই। সংসারে তৈরি হয়েছে ক্রমবর্ধমান চাপ ও অনিশ্চয়তা।
রাজধানীতে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, অস্থায়ী কারখানার শ্রমিক এবং রিকশাচালকদের বড় একটি অংশ দৈনিক গড়ে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। তবে এই আয় নিয়মিত নয়। কাজ না থাকলে পুরো দিনই শূন্য হাতে ফিরতে হয়। আবার অসুস্থতা, বৃষ্টি কিংবা মৌসুমি কাজের সংকট দেখা দিলে দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকতে হয়। এতে মাস শেষে প্রকৃত গড় আয় আরও কমে যায়।
রাজধানীর মধ্যবাড্ডায় ভোর থেকে সকাল ৮-৯টা পর্যন্ত দেখা মেলে এক ভিন্ন বাস্তবতার। সেখানে কোদাল, কাস্তি ও ঝুড়ি হাতে অপেক্ষা করেন অনেক শ্রমিক। তারা মূলত দৈনিক ভিত্তিতে নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে আসেন। কাজের চাহিদা থাকলে সেখান থেকেই শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া হয়। কাজভেদে আট ঘণ্টা পরিশ্রমের পর তারা পান ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা মজুরি।
এই বাস্তবতার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন আবুল হোসেন, একজন দিনমজুর। তিনি মাটি কাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন। শ্রমিক দিবস ও জীবনের হিসাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন কাজ পাই না, তবুও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আয় আর ব্যয়ের হিসাব কোনভাবেই মিলে না। প্রতিদিন ভোর এসে এখানে বসি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি। যেদিন কাজ পাই, আট ঘণ্টা পরিশ্রম শেষে হাতে পাই ৭০০-৮০০ টাকা। বলতে গেলে, এক দিন কাজ পাই তো এক দিন পাই না। তার মানে এক দিনের পারিশ্রমিক দিয়ে দুই দিন সংসার চালাতে হয়।’
পরিবার ও ব্যয়ের চাপে তার জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘মাসে ৬০০০ টাকা ঘর ভাড়ার জন্য রাখতে হয়। বউ আর দুই বাচ্চা আছে। চাল, সবজি কিনতেই সব টাকা শেষ। মাছ-মাংস খুব কম কেনা পড়ে। বছরে খুব কম সময়ে সবার জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনতে পারি। কেউ অসুস্থ হলে ধার-দেনা করে চিকিৎসা করাতে হয়। বাধ্য হয়েই এই অল্প পারিশ্রমিকের অনিশ্চিত কাজ করে যেতে হচ্ছে প্রতিদিনই।’
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে যখন শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন দেশের এই শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা তুলে ধরছে এক ভিন্ন চিত্র—যেখানে পরিশ্রম আছে, কিন্তু স্থিতি নেই; আয় আছে, কিন্তু স্বস্তি নেই।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজমিস্ত্রি দিনে সাধারণত ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা, জোগালি ৭০০ টাকা, মাটিকাটা শ্রমিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং কাঠমিস্ত্রি ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। তবে এই পুরো অর্থ তাদের হাতে আসে না। অনেক ক্ষেত্রেই সরদারের অধীনে কাজ করলে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কেটে রাখা হয়। দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের অংশও বাদ যায়। ফলে ঘোষিত মজুরির তুলনায় বাস্তবে আয় আরও কমে যায়।
এ বাস্তবতার মধ্যেই চলছে শ্রমজীবী মানুষের জীবন। মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকার নির্মাণশ্রমিক মাসুদ রানা জানান, সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করে তিনি প্রায় ৮০০ টাকা মজুরি পান। মাসে গড়ে ২০ দিন কাজ মিললে আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু এই আয়ের বড় অংশই চলে যায় ঘরভাড়ায়। তিনি বলেন, ছয় হাজার টাকা ভাড়া দেওয়ার পর বাকি টাকায় তিনজনের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তার ভাষায়, ‘খাব কী, আর চলব কীভাবে?’
রিকশাচালক বেলাল হোসেনের জীবনেও একই চিত্র। আগে জোগালি হিসেবে কাজ করলেও এখন তিনি রামপুরা এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। দিনে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় হলেও এর মধ্যে প্রায় ৫০০ টাকা জমা এবং চার্জ খরচে চলে যায়। ফলে হাতে থাকে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। তিনি জানান, নিত্যপণ্যের দামের কারণে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সন্তানদের পড়ালেখা, চিকিৎসা এবং গ্রামে টাকা পাঠানো—সবই এখন ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের আয়ের এই অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয় কাজ না থাকলে। বৃষ্টি, অসুস্থতা বা মৌসুমি সংকটে অনেক দিন আয় থাকে শূন্য। ফলে একদিনের আয়ে দুই দিনের সংসার চালানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় অনেকের জীবনে। আয়ের বড় অংশ ঘরভাড়ায় চলে যাওয়ায় খাদ্য, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার মতো মৌলিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংসসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল। কিন্তু সেই তুলনায় আয় না বাড়ায় তারা কোনো সঞ্চয় গড়তে পারছেন না। অনেকে ধার-দেনা করে মাস পার করছেন, কেউ আবার এনজিও বা ব্যক্তিগত ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ না করলে শ্রমজীবী মানুষের জীবন আরও সংকটাপন্ন হবে। তারা ন্যূনতম মজুরি হালনাগাদ, অনিয়মিত শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসা সহায়তা এবং স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ছাড়া সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই মে দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাস্তব জীবনে শ্রমিকের আয়ের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
শিকাগোর সংগ্রামের ইতিহাস আর শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস:
শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তাক্ত অধ্যায় শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গভীর মোড় বদলে দেয়। সেই সংগ্রামে শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টা ও ন্যায্য অধিকারের যে স্বপ্ন গড়েছিলেন, তার ১৬০ বছর পরও বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই চিত্র যেন অনেকটাই অপূর্ণ। রাজধানীর বাড্ডা, মিরপুর বা রামপুরার মতো এলাকার ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর আবুল হোসেন কিংবা নির্মাণশ্রমিক মাসুদ রানার দীর্ঘশ্বাসে সেই প্রশ্নই আবারও ফিরে আসে—এই স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হয়েছে?
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস এলেই শহরজুড়ে র্যালি, স্লোগান আর নানা আয়োজন চোখে পড়ে। কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালেই রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজের অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের জীবনে দেখা যায় ভিন্ন এক বাস্তবতা। কাজ মিলবে কি না, দিনের শেষে ঘরে খাবার যাবে কি না—এই অনিশ্চয়তাই তাদের নিত্যসঙ্গী।
উন্নয়নের অগ্রযাত্রার গল্পের ভেতরেই শ্রমিকদের জীবনে জমে আছে চাপা কষ্ট। বাজারদরের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আর স্থির আয়ের সীমাবদ্ধতা তাদের সংসারকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে। বাসাভাড়া, চিকিৎসা আর সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেকেই ঋণের চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। ফলে মে দিবসের মূল বার্তা—শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার—এখনও অনেকের জীবনে বাস্তবতার বদলে প্রতীকী উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ।
শিকাগোর আন্দোলনের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, অধিকার কখনও স্বাভাবিকভাবে আসে না, তা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই অর্জন করতে হয়। কিন্তু যেখানে শ্রমিক এখনও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে ‘সমান অংশীদার’ হিসেবে নয়, বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হন, সেখানে সেই সংগ্রাম আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুল শ্রমজীবী মানুষ এখনও আইনগত ও সামাজিক সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছেন।
এই বাস্তবতায় মে দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা ছুটির দিন হয়ে থাকলে তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। শ্রমিকদের জীবনে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং স্থিতিশীল জীবনের নিশ্চয়তা ছাড়া উন্নয়নও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই এই দিনটি হোক কেবল স্মরণ নয়, বরং শ্রমিকের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনার অঙ্গীকারের দিন।
শিকাগোর রক্তরাঙা অধ্যায় তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রমিকের জীবনেও মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বস্তির আলো পৌঁছে যাবে।
শিকাগোর রক্তাক্ত হে মার্কেটের ধুলো উড়ে গেছে সময়ের পরতে পরতে, কিন্তু সেখানে লেখা শ্রমিকের অধিকারের চিৎকার আজও মুছে যায়নি। আট ঘণ্টার কাজের স্বপ্ন, ন্যায্য মজুরির দাবি আর মর্যাদার লড়াই—এই তিনটি শব্দ এখনও বিশ্বের কোটি শ্রমজীবী মানুষের বুকে নীরব আগুন হয়ে জ্বলছে।
বাংলাদেশের ফুটপাত, নির্মাণ সাইট কিংবা ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের চোখেও সেই একই প্রশ্ন—এই উন্নয়ন কার জন্য? রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে হাত শহর গড়ে তোলে, সেই হাতই কি শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রামে বন্দি থাকবে?
ইতিহাস সাক্ষী, অধিকার কখনো নিজে থেকে আসে না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—১৬০ বছর পরও কি সেই ইতিহাসের শিক্ষা আমাদের বাস্তবতায় কেবল স্মৃতিই হয়ে থাকবে, নাকি একদিন সত্যি হবে প্রতিটি শ্রমিকের মর্যাদার জীবন? উত্তর হয়তো সময় দেবে, কিন্তু আজও শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাসই শেষ কথা হয়ে আকাশে ভেসে বেড়ায়।

