দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের অর্থায়ন সংকট নিরসনে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এসএমই খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ঋণ তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবেন বলে জানিয়েছে সরকার।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, শিল্প, সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ানোকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সে লক্ষ্যেই এসএমই, কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের তিনটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এসএমই ফাউন্ডেশন, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এবং বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল)।
শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণের বাইরে অবস্থান করছেন। ব্যবসায়িক নিবন্ধন, কর শনাক্তকরণ নম্বর বা ভ্যাটসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে অনেকেই ব্যাংকিং সুবিধা পান না। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে তুলনামূলক কম আগ্রহ দেখায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সিএমএসএমই খাতের এই বৃহৎ অংশকে ঋণসুবিধার আওতায় আনা জরুরি। সে বিবেচনায় বাজেটে ঘোষিত ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে ঋণের অর্থ যেন সুষমভাবে বিতরণ হয়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এসএমই খাতের জন্য দুই অর্থবছরে মোট ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে গত ২১ মে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার কোটি এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য আরও ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে শিল্পমন্ত্রী উল্লেখ করেন, আগামী পাঁচ বছরে এসএমই খাতে ৩০ হাজার নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। নতুন তহবিল গঠন করা গেলে এ কর্মসূচি সারা দেশে বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। যদিও শিল্প মন্ত্রণালয় এসএমই ফাউন্ডেশনের জন্য অর্থ বরাদ্দ চেয়েছিল, বাজেট প্রস্তাবে ঋণ বিতরণে তিনটি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঘোষিত ২ হাজার কোটি টাকার তহবিলের কাঠামো ও অর্থ বণ্টনের বিষয়ে আগামী জুলাই বা আগস্টে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি আরও জানান, যে প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল পাবে, তাদের নিজেদের উদ্যোগেই সরাসরি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি সব ধরনের ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জন্য ঋণ সুবিধা উন্মুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।
করোনা মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় ২০২১ সালে সরকার পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ বিতরণ করেছিল। এর মধ্যে এসএমই ফাউন্ডেশন পেয়েছিল ৩০০ কোটি টাকা।
সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, এসএমই ফাউন্ডেশন ৪ শতাংশ সুদে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ করে। পরে ঋণের অর্থ ফেরত আসার ভিত্তিতে একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠন করা হয়। এ পর্যন্ত সংস্থাটি ১৫ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে ঋণ সুবিধা দিয়েছে।
এসএমই উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো সাধারণত অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে অনাগ্রহী। ফলে ঋণের বড় অংশ চলে যায় মাঝারি ও তুলনামূলক বড় উদ্যোক্তাদের হাতে। নতুন তহবিলের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি রাশেদুল করিমের মতে, তহবিলের অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে হলে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক কোটা নির্ধারণেরও প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় ঋণ সুবিধা প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে না পৌঁছে সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই আটকে থাকার আশঙ্কা থাকবে।

