আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সরকারগুলোর বড় স্বপ্ন ও পরিকল্পনা থাকাটা স্বাভাবিক। নতুন বাজেটেও সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এই বাজেটের সামঞ্জস্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এই বাজেটের মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ বাড়ালে কিছুটা গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু এত বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর ধারণা, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হলে বাজেট ঘাটতিও আরও বাড়বে।
এ অবস্থায় সরকার ঘোষিত ব্যয় কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। তাঁর মতে, তখন সরকারের সামনে দুটি পথ থাকবে। একদিকে অতিরিক্ত অর্থ ছাপিয়ে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা, অন্যদিকে ব্যয় কমিয়ে আনা। তবে অর্থ ছাপানোর পথ বেছে নিলে মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের বড় অংশের অর্থ সরকারের প্রয়োজন মেটাতেই ব্যবহৃত হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অর্থনীতিতে সরকারের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ। ফলে সরকার যদি আর্থিক খাতের অধিকাংশ সম্পদ নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের সংকট তৈরি হবে। আর বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতি হারাবে।
আহসান এইচ মনসুরের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ছিল ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সরকার তার পরিবর্তে চাহিদা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার কৌশল নিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। তাঁর আশঙ্কা, এই পথে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বিদেশি ঋণ ও সহায়তা অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিও অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি। এতে বাহ্যিক উৎস থেকে প্রত্যাশিত অর্থ না এলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর চাপ বাড়বে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একাধিক ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে।
তবে তিনি মনে করেন, বেসরকারি খাতকে বিদেশমুখী করার উদ্যোগ ইতিবাচক। সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর বিদেশি ঋণ নেওয়ার আগ্রহের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা রাখে, তাদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ কিছুটা কমবে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের ঘোষিত প্রণোদনাকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ ধরনের বিনিয়োগ যেন শুধু প্রণোদনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশে এনে পরে আবার বিদেশে সরিয়ে নেওয়া না হয়। বিনিয়োগের অর্থ যাতে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সরকারের অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন তিনি। তাঁর মতে, নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি সরকারের সহানুভূতির প্রতিফলন দেখা যায় পরিবার কার্ড কর্মসূচিতে। তিনি পরামর্শ দেন, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের সব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজের মাধ্যমে পরিবার কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হলে এর সুফল আরও বাড়বে।
তবে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা হিসেবে তিনি ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেন। সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়লে এই দুর্বলতা আরও প্রকট হতে পারে। এমনিতেই ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে নতুন করে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে আমানত প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে পূর্বে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
ভারতের উদাহরণ টেনে আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশটিতেও বড় ঘাটতির বাজেট দেখা যায়। কিন্তু তাদের ব্যাংক ও আর্থিক খাত শক্তিশালী ও গভীর হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নে তেমন সমস্যা হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। দুর্বল ও সীমিত সক্ষমতার আর্থিক খাত নিয়ে এত বড় ঘাটতির বাজেট বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাকেও তিনি দুর্বল ও অদক্ষ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। অদক্ষতা ও দুর্নীতি রাজস্ব আদায়ের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি নতুন করে বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
কর কাঠামো নিয়েও তিনি মত দেন। তাঁর ভাষায়, করহার যত বাড়ে, কর ফাঁকির প্রবণতাও তত বাড়ে। তাই সংস্কারের মাধ্যমে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সবশেষে তিনি বলেন, বাজেটে ব্যবসাবান্ধব বেশ কিছু উদ্যোগ রাখা হয়েছে। তবে সেগুলোর বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা যাতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, অপ্রয়োজনীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কমানো গেলে বেসরকারি খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও তার সুফল পাবে।

