বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রায় ২৬টি অফশোর ব্লক নিয়ে নতুন একটি বড় দরপত্র শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) আকৃষ্ট করতে এবার শর্তে আনা হয়েছে একাধিক সুবিধা ও ছাড়।
পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই দরপত্র প্রক্রিয়াটি খুব দ্রুতই শুরু হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ইতোমধ্যে মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং চুক্তি (এমপিএসসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠিয়েছে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহেই মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুমোদন মিললেই সঙ্গে সঙ্গে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র আহ্বান করা হবে।
নতুনভাবে নির্বাচিত বিএনপি-সমর্থিত সরকারের উদ্যোগে এই দরপত্র দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে উঠেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আরাফানুল হক জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে মডেল চুক্তির শর্ত আরও শিথিল করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে শ্রমিকদের মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, গ্যাস আবিষ্কারের পর পাইপলাইন নির্মাণ ও পরবর্তী কার্যক্রমের দায়িত্বও সহজ করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, সর্বশেষ অফশোর দরপত্রে ছয়টি আইওসি আগ্রহ দেখালেও কেউ অংশ নেয়নি। যদিও অনেক কোম্পানি দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছিল। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, অফশোর ব্লক সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি নিয়ে আস্থার ঘাটতিই মূল কারণ ছিল। ২০২৪ সালের ১০ মার্চ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর প্রায় ৯ মাস পর্যন্ত এটি খোলা ছিল। সেই সময় ২৪টি অফশোর ব্লক—এর মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্র এবং ৯টি অগভীর সমুদ্র ব্লক—অনুসন্ধানের জন্য দেওয়া হয়েছিল।
নতুন কাঠামোতে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসের দাম তেলের বাজারের ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হবে। গত দরপত্রে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ হিসেবে। অর্থাৎ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার হলে গ্যাসের দাম দাঁড়াত প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ১০ ডলার। এই মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি গভীর ও অগভীর—উভয় ব্লকের জন্যই একই ছিল।
নতুন প্রস্তাবে আইওসিদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—দেশীয় চাহিদা পূরণের পর গ্যাস রপ্তানির সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগও থাকবে। এছাড়া ১০০ শতাংশ খরচ পুনরুদ্ধারের সুবিধা রাখা হয়েছে, যেখানে বছরে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সীমা থাকবে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ অফশোর দরপত্র হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন মাত্র তিনটি গভীর সমুদ্র ব্লক ছিল। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো-দেউও একটি ব্লক পেলেও ২০২০ সালে ২ডি সিসমিক সার্ভে করার পর সেটি ছেড়ে দেয়। এর আগে ২০১২ সালের দরপত্রে তিনটি অগভীর ও একটি গভীর সমুদ্র ব্লক দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে চারটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি বিভিন্ন ব্লকে অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে।
চেভরন তিনটি গ্যাস ফিল্ডে উৎপাদনে রয়েছে। ক্রিসএনার্জি একটি গ্যাস ফিল্ড থেকে গ্যাস উৎপাদন করছে। এছাড়া ওএনজিসি বিদেশ ও অয়েল ইন্ডিয়া যৌথভাবে দুটি অগভীর ব্লকে অনুসন্ধান করছে।

