বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের কারিগর হিসেবে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্যকর ভূমিকায় রয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। পল্লী উন্নয়নে জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ১৬ এপ্রিল ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পেয়েছে সংস্থাটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা, ক্ষুদ্র উদ্যোগের বিকাশ এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পিকেএসএফের বর্তমান কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের।
সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হলেও পিকেএসএফ ব্যতিক্রম। এ সাফল্য কীভাবে সম্ভব হলো?
—আমি মনে করি, যেকোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার জন্য প্রথম দরকার শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অভিপ্রায় বা ইনস্টিটিউশনাল ইনটেনশন। এটা কেবল কোনো একজনের ব্যক্তিগত ইচ্ছায় হবে না। বরং একটি আর্থসামাজিক সমস্যা দূরীকরণের অভিপ্রায়কে সামষ্টিক অভিপ্রায়ে পরিণত করে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
ক্ষুদ্র ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯০৫ সালে শুরু হওয়া সমবায় আইনের মাধ্যমে স্বকর্মসংস্থান উৎসাহিত করার একটি প্রবণতা সব সময় ছিল। কিন্তু তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খুব সফল হয়নি। স্বকর্মসংস্থানের প্রধান সমস্যা হলো পুঁজির সংকট। সমবায়গুলো নানা কারণে ফলপ্রসূ হয়নি, কারণ সেখানে দরিদ্র ও সচ্ছলরা একসঙ্গে মিশে যেত এবং দরিদ্ররা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ত।
১৯৬০-এর দশকে একটি গবেষণা হয়েছিল। তখন দরিদ্র মানুষ সম্পর্কে দর্শনগত ধারণা ছিল যে তাদের দক্ষতা নেই, তাই ভর্তুকি দিয়ে ঋণ দিতে হবে। কিন্তু যখনই আপনি খুব বেশি ভর্তুকি দেবেন, তখন তা দখল করার জন্য যে প্রতিযোগিতা হয়, তাতে গরিব মানুষরা ভর্তুকির সুফল নিতে সক্ষম হয় না। ফলে লক্ষ্যভুক্ত দরিদ্র মানুষের মাত্র ১০ শতাংশের কাছে এ ঋণ পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। আরেকটি সমস্যা ছিল, এ ধরনের কর্মসূচির ব্যয় আয় থেকে উঠে আসত না এবং খেলাপি ছিল অনেক। সমবায়গুলোর কোনো পেশাদার ঋণ কর্মসূচি করার একাগ্রতা ছিল না।
স্বাধীনতার পর নব উদ্যমে কিছু প্রকল্প নেয়া হয়, যেমন—এএসএআরআরডি (এশিয়ান সার্ভে অব এগ্রেরিয়ান রিফর্ম অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট) ও আরএফইপি (রুরাল ফাইন্যান্স এক্সপেরিমেন্টাল প্রজেক্ট)। এএসএসএআরডি ব্যর্থ হলেও তা থেকে কিছু শিক্ষা নেয়া হয়। এর প্রধান পর্যালোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত গ্রামীণ ব্যাংক প্রকল্প ১৯৭৬ সালে শুরু হয়।
দেখা গেল, লক্ষ্যভুক্ত স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে একনিষ্ঠ অভিনিবেশ দেয়া প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের মাধ্যমে একটি টেকসই ঋণ কর্মসূচি পরিচালনা করা সম্ভব, যা ভর্তুকি পরিহার করে আয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। সে পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ধারণাটি একটি নীতিগত বিষয় হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করল। এর তিনটি প্রধান দিক ছিল—প্রতিষ্ঠানের একমাত্র লক্ষ্য হতে হবে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সেবা দেয়া, সুদের হার এমন হবে যেন প্রতিষ্ঠানের ব্যয় উঠে আসে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা কাঠামো হবে দরিদ্রবান্ধব।
এরপর ১৯৮৩ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনা শুরু হয় কীভাবে এটাকে আরো ছড়িয়ে দেয়া যায়। পিকেএসএফ গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে সাত বছর সময় লেগেছে। ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাংকের দেয়া ধারণা প্রত্যাখ্যান করে সম্পূর্ণ দেশজ ধারণার ভিত্তিতে পিকেএসএফের জন্ম হয়। মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়া, যা দারিদ্র্য বিমোচনে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করবে। ১৯৯০ সালের এপ্রিলে পিকেএসএফ একটি ‘অলাভজনক’ কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কারণ ছিল পাবলিক অর্গানাইজেশনের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, অথচ এ ধরনের কাজে প্রচুর নমনীয়তা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা প্রয়োজন। এটি তখন সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা ছিল যে একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান অনেকগুলো ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান তৈরিতে অনুঘটকের কাজ করবে।
১৯৯০ সালে সম্পূর্ণ দেশজ অর্থায়নে পিকেএসএফের যাত্রা শুরু হয়। এর সাফল্যের কারণ হলো সরকারের অনুকূল নীতিগত পরিবেশ। এর চেয়ারম্যান ও বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন উন্নয়ন ক্ষেত্রে দক্ষ ও স্বনামধন্য ব্যক্তি। কোনো রানিং সিভিল সার্ভেন্ট এতে থাকতে পারতেন না, যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা যায়। সরকার সব নির্বাহী ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা বোর্ডের হাতে ছেড়ে দেয়। সরকার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অর্থায়ন শুরু করে। প্রথম ছয় বছর পিকেএসএফ কারো কাছ থেকে টাকা নেয়নি। এ সময় সরকারের কাছ থেকে ২৫ কোটি টাকা পেয়ে পিকেএসএফ তা ব্যবহার করে এনজিওগুলোর অর্থায়নের পলিসি ও কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রমাণিত কাঠামো তৈরি করে।
আমরা প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নকে অর্থায়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিলাম। পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ড ঘোষণা করলাম, নির্দিষ্ট কী মান অর্জন করলে অব্যাহত অর্থায়ন পাওয়া যাবে। এর মাধ্যমে সীমিত সময়ের প্রকল্পের স্থলে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রণোদনা পাওয়ার ফলে পেশাদারত্ব তৈরির সূচনা হলো। আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিতাম এবং অনুদান পরিহার করে সহজ শর্তে ঋণ দিতাম। সাবসিডাইজড লোন দিয়ে বলা হতো যদি ঠিকমতো ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করতে পারে, তবে যে মার্জিন তারা পাবে তা থেকে ব্যয় নির্বাহের পরও নিজস্ব ইকুইটি গড়ে তুলতে পারবে।
এর ফলে তারা নিজস্ব পুঁজি গঠন করতে শিখল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা কেবল মডারেট দরিদ্র নয়, বরং অতিদরিদ্র, ক্ষুদ্র কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা কর্মসূচি শুরু করলাম। দেখলাম কেবল অর্থ দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়, তাই এর সঙ্গে স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও ঝুঁকি মোকাবেলার মতো বিষয়গুলো যুক্ত করলাম। ২০০৩ সাল থেকে আমরা কারিগরি সহায়তা ও ভ্যালু চেইন ইন্টারভেনশন শুরু করি।
পিকেএসএফ কোনো বিদেশী বা দেশী কনসালট্যান্টনির্ভর প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশজ মূল্যবোধ ও চাহিদার ভিত্তিতে নিজস্ব ধারণার ওপর আমরা গড়ে উঠেছি। পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা থেকে শুরু করে মেক্সিকো ও কেনিয়া পর্যন্ত আমাদের আদলে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। আমরা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে কেবল স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কাজ করেছি, যা সব সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। পিকেএসএফ এখন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের একটি চমৎকার উদাহরণ।
এ ধারাবাহিকতার জন্য আপনারা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পেয়েছেন। এ স্বীকৃতির ফলে কি আপনাদের দায়বদ্ধতা আরো বেড়ে গেল?
আমরা আরো সতর্ক হয়ে গেছি। নানা কৌশলগত কারণে আমরা প্রচারবিমুখ ছিলাম। স্বীকৃতির ফলে আমরা এখন আমাদের কাজগুলো মানুষের কাছে আরো বেশি তুলে ধরতে চাই। আমাদের অংশীদার সংস্থাগুলোর মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষের একটি পরিবার আছে। আমরা মূলত জনগণের টাকা ব্যবহার করি, তাই তাদের জানানো দরকার যে এ টাকা দিয়ে কী চমৎকার কাজ হচ্ছে।
বর্তমানে আমাদের প্রায় ২০০টি সক্রিয় সহযোগী সংস্থা আছে, যাদের ২০ হাজারেরও বেশি শাখা সারা দেশে বিস্তৃত। আমাদের কাজের তিনটি প্রধান স্তম্ভ আছে—কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ঝুঁকি হ্রাস ও দক্ষতা বৃদ্ধি। আমরা দেখেছি, ঝুঁকি মোকাবেলার সক্ষমতা না থাকলে মানুষের উন্নতি টেকসই হয় না। তাই আমরা স্বাস্থ্যবীমা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় কাজ করছি। এছাড়া বর্তমান যুগে টিকে থাকতে হলে দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। কাজেই তৃণমূল পর্যায়ের তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা আমাদের কার্যক্রমগুলোর ত্রিস্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ।
ক্ষুদ্র ঋণে উচ্চ সুদের যে ধারণা, সেটা নিয়ে আপনার অভিমত কী?
ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার নিয়ে যে সমালোচনা হয়, তা মূলত তুলনা করার মানদণ্ডের কারণে। আপেলের সঙ্গে কমলার নয়, আপেলেরই তুলনা করতে হয়। মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন বা এমএফআইয়ের সুদের হারের তুলনা করা হয় ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে, যা সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। দুটোর মার্কেট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যাংকের ঋণের সঙ্গে ক্ষুদ্র ঋণের তুলনা করা ঠিক নয়, কারণ এর ব্যবস্থাপনা ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। গ্লোবাল প্র্যাকটিসের তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার বরং কম। খুব বেশি ভর্তুকিতে ঋণ দিলে প্রশ্ন আসে এটা কে বহন করবে?
সরকার দিলে জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচির ভর্তুকির বিপুল ব্যয়ের কারণে সরকারকে অনেক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কমাতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যখনই অনেক ভর্তুকিতে কোনো সেবা দেবেন, তখনই রিসোর্স অ্যালোকেশনে নানা রকম অদক্ষতার সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে সারা দেশে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ হয়, যার মধ্যে আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলো প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা বিতরণ করে। আমরা এখন ডিজিটাল ফাইন্যান্সিংয়ের দিকে যাচ্ছি, যা বাস্তবায়িত হলে ব্যবস্থাপনা খরচ কমবে এবং সুদের হার আরো কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি দেখেছে সুপারভিশন কস্ট সব মিলিয়ে প্রায় ২০-২১ শতাংশের নিচে না হলে এটা ভায়াবল হয় না। এখানে আরেকটি দেখার বিষয় হলো ঋণগ্রস্ততা তৈরি হচ্ছে কিনা। ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোফাইন্যান্স পরিচালিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঋণগ্রস্ততা সৃষ্টি হচ্ছে না। এ বিষয়ে পিকেএসএফ বিভিন্ন বিরতিতে গবেষণা করে থাকে।
বর্তমান বাজারে ক্ষুদ্র ঋণ দারিদ্র্য দূর করতে কতটা ভূমিকা রাখছে? ঋণের জালে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই শুধু বাড়ছে কি?
ক্ষুদ্র ঋণ মূলত একটি ‘ডেট ইনস্ট্রুমেন্ট’। এর একটি সীমাবদ্ধতা হলো ঋণের ঝুঁকি প্রায় সম্পূর্ণরূপে ঋণগ্রহীতাকেই বহন করতে হয়। সুদের হার বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ অথচ উচ্চ লাভের সম্ভাবনাময় উদ্যোগ গ্রহণে নিরুৎসাহিত বোধ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষুদ্র ঋণের ফলে মানুষের ভোগের মান উন্নত হয় এবং অতিরিক্ত আয় হয়। তবে পুঁজি গঠন বা বড় সমৃদ্ধির পথে যাওয়ার জন্য কেবল এ ঋণ যথেষ্ট নয়।
এজন্য আমরা এখন ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ বা মিশ্র অর্থায়নের কথা ভাবছি। সেখানে ঋণ, অনুদান, ইকুইটি এবং বীমা মিলে একটি প্যাকেজ থাকবে। এতে উদ্যোক্তাদের ঝুঁকিগ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে তারা উদ্যোগ সম্প্রসারণে উৎসাহিত হবেন বলে আশা করি। আমরা সাড়ে তিনশরও বেশি ভ্যালু চেইন উন্নয়ন করেছি। ভ্যালু চেইনের হৃৎপিণ্ড হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোগ। আমরা চাই আমাদের উদ্যোক্তারা যেন উন্নতমানের পণ্য সারা দেশে বিপণনের পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করতে পারেন। এখন প্রয়োজন মূলত ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং—ইকুইটি, ডেট এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, তার সঙ্গে গ্যারান্টি ফাইন্যান্সিং এবং বীমাকে ইন্টিগ্রেড করা। এর সঙ্গে সার্টিফায়েড উন্নত পণ্য উৎপাদন করা অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত থাকবে। এছাড়া অনুকূল ও ইতিবাচক সামষ্টিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
একদম যারা নতুন, যাদের ইকুইটি নেই, তাদের ক্ষেত্রে?
প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ তরুণ প্রতি বছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। এর মাত্র ১৫ শতাংশ আনুষ্ঠানিক খাতে কাজে যুক্ত হয়। বাকিদের কোনো ক্রেডিট ইতিহাস নেই বলে ব্যাংক বা এমএফআই কেউ টাকা দেয় না। এজন্য আমরা স্টার্টআপ ক্যাপিটালের ব্যবস্থা করছি। নতুনদের ক্ষেত্রে ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকায় আমরা ‘সাইকোমেট্রিক অ্যানালাইসিস’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করার টুল তৈরি করছি। এ টুলগুলো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অর্থায়নকারীদের জন্য সহায়ক হবে।
আপনারা কীভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের টেকসই হতে সাহায্য করছেন? কোনো সাফল্যের গল্প আছে কি?
আমাদের দেড়-দুই লাখ সফল উদ্যোক্তা আছেন যারা অতি ক্ষুদ্র পর্যায় থেকে মাঝারি পর্যায়ে গেছেন। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের একটি উদাহরণ দেই। সেখানে দুধের দাম খুব কম ছিল কারণ কেবল মিষ্টির দোকান ছিল প্রধান ক্রেতা। আমরা সেখানে পনির ও ঘিসহ ১১ ধরনের পণ্য তৈরির কারিগরি সহায়তা দিলাম। এতে দুধের চাহিদা বেড়ে গেল। একজন ঘি বিক্রেতা আগে বছরে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ঘি বিক্রি করতেন, এখন তিনি মাসে ১৩ লাখ টাকার ঘি বিক্রি করেন। প্রায় নিঃস্ব অবস্থা থেকে বগুড়ার একজন তরুণী এখন ১৭টি দেশে গরুর মাংসের আচার রফতানি করছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে মোজারেলা চিজ যুক্তরাষ্ট্রেও রফতানি হচ্ছে। এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে যাদের তথ্য আমাদের কাছে আছে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য আমাদের ‘ওস্তাদ-সাগরেদ প্রোগ্রাম’ আছে। ১৫ হাজার ওস্তাদের অধীনে প্রায় ৮০ হাজার তরুণকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৭৩ শতাংশ তরুণ ওস্তাদদের নিজস্ব কারখানাতেই স্থায়ী কর্মসংস্থান পাচ্ছেন। কোনো ‘সাগরেদ’ যদি নিজে ব্যবসা শুরু করতে চান, তবে আমরা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করি।
এ ধরনের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ দেশের বাইরে পণ্য রফতানি করছেন?
রফতানির ক্ষেত্রে ঠাকুরগাঁওয়ে একজন নারী উদ্যোক্তার মোজারেলা পনির তৈরির উদাহরণ দেয়া যায়। প্রথমে জাপানি ক্রেতাদের কাছে পাঠালে তারা পছন্দ করেনি। আমরা এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। সেই প্রচেষ্টায় এখন মোজারেলা চিজ বাংলাদেশ থেকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হচ্ছে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, ৫৪ জন উদ্যোক্তা এখন মোজারেলা চিজ তৈরি করেন। তাদের উদ্যোগে প্রায় ৭৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমরা পণ্যের ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের কাজ শুরু করেছি, যা বিদেশী ক্রেতাদের আস্থা বাড়াবে।
এলডিসি উত্তরণের ফলে অনুদান কমে গেলে পিকেএসএফের তহবিলের বিকল্প উৎস কী হবে?
আমরা এটা নিয়ে ভাবছি। এসকাপের মতে, আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি আছে। আমরা এর মধ্যে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার সংস্থান করতে পেরেছি। এ টাকা সরকারের পক্ষে দেয়া সম্ভব না। এটা দিতে পারে মানি ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল হতে পারে অর্থায়নের বড় উৎস। নেপালের মতো ব্যাংকগুলোর কারেন্ট অ্যাকাউন্টের একটি নির্ধারিত অংশ এ খাতে স্বল্প সুদে পিকেএসএফকে দেয়ার চিন্তা করা যেতে পারে। আমাদের পুঁজিবাজার এবং বন্ডের দিকেও যেতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দেয়া যায়। দেশটি বড় করপোরেটদের দিয়ে শুরু করলেও পরে নীতি পরিবর্তন করে এসএমইকে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করে। আমাদের দেশেও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো দরকার। পিকেএসএফ এরই মধ্যে ১৫-১৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করেছে।
পিকেএসএফের জলবায়ু তহবিলের প্রকল্প নিয়ে বলুন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বৈশ্বিক তিনটি প্রধান তহবিল—গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ), অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গর্বের বিষয় যে বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুটি সংস্থা এ স্বীকৃতি পেয়েছে—পিকেএসএফ ও ইডকল। পিকেএসএফ বাংলাদেশের একমাত্র সংস্থা হিসেবে তিনটি তহবিলেরই অ্যাক্রেডিটেশন লাভ করেছে।
আমরা মূলত তিনটি সংকটাপন্ন এলাকায় কাজ করছি—দক্ষিণবঙ্গের লবণাক্ত এলাকা, উত্তরবঙ্গের খরা অঞ্চল এবং যমুনা অববাহিকার বন্যাপ্রবণ অঞ্চল ও হাওর এলাকা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে আমরা ৭০০ কিলোমিটার খাল খনন এবং ১ হাজারটি পুকুর পুনঃখননের কাজ করছি। বায়ুমণ্ডলের কার্বন মাটিতে ধরে রাখতে ‘বায়োচার’ ব্যবহারের প্রয়োগ নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। এখন পর্যন্ত প্লাবন এলাকার ৪০ হাজার মানুষের বসতভিটা উঁচু করে দেয়া হয়েছে এবং চার হাজারটি দুর্যোগ সহনশীল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।
এ বিশাল কর্মযজ্ঞে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত করছেন?
পিকেএসএফের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো নিবিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। দেশের ২০০টি সহযোগী সংস্থার ২০ হাজার শাখার কার্যক্রম প্রধান কার্যালয়ে বসে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। শাখাগুলোর প্রায় ৯৭ শতাংশই এখন ‘রিয়েল-টাইম’ মনিটরিংয়ের আওতায়। আমরা জিআইএস (ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা) ভিত্তিক সিস্টেমে রূপান্তর করছি। গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে সুবিধাভোগীদের অবস্থান এবং প্রকল্পের বাস্তব ছবি দেখা সম্ভব। স্যানিটেশন প্রোগ্রামের আওতায় প্রায় ১০ লাখ হাইজেনিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে, যার প্রতিটি ‘জিও-লোকেটেড’।
পিকেএসএফের শক্তিশালী নিরীক্ষা কমিটি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে। যাবতীয় ক্রয় কার্যক্রমে পিপিআর অনুসরণ করা হয়। এছাড়া প্রতিটি প্রকল্পের প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির প্রধান হচ্ছেন সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। কোম্পানি আইনের আওতায় প্রতি বছর পিকেএসএফ অডিট ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষিত হয়। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), জাইকা ইত্যাদি উন্নয়ন সহযোগী বছরের বিভিন্ন সময় পিকেএসএফের আর্থিক ও কার্যক্রমের নিরীক্ষা সম্পন্ন করে এবং সরকারের কাছে তা উপস্থাপন করে।
আসন্ন বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা ও পিকেএসএফের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমরা নিজেদের ‘টেক অফ’ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছি। আসন্ন বাজেটে আমরা চাই সরকার নিয়মিত কিছু প্রণোদনা নিশ্চিত করুক। বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি যে কৃষি ঋণ বা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করে, সেগুলো পিকেএসএফের মাধ্যমে ‘চ্যানেল’ করার প্রস্তাব করছি। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ-সংক্রান্ত কার্যক্রমের কার্যকারিতা আরো বৃদ্ধি পাবে, খরচ কমবে এবং মাঠ পর্যায়ে ঋণের কার্যকারিতা বাড়বে।
বর্তমান সিএসএমই পলিসির সুবিধা বড় এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে যায়। আমরা কটেজ ও মাইক্রো এন্টারপ্রাইজকে আলাদা করার জন্য পলিসি অ্যাডভোকেসি করতে চাই। অর্থায়নের জন্য আমরা শুধু বিদেশী মুদ্রার ওপর নির্ভর করতে চাই না; বরং ইন্টারনাল রিসোর্স এবং ক্যাপিটাল মার্কেটের ওপর জোর দিচ্ছি। ইকুইটি মার্কেট এবং পেনশন ফান্ডের মতো লো-কস্ট তহবিলগুলো ব্যবহারের পথ খুঁজছি।
আমাদের প্রয়োজন সফল বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলোকে দেশীয় প্রেক্ষাপটে ‘কনটেক্সচুয়ালাইজ’ করা। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পিকেএসএফ একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য ‘সহায়ক প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে কাজ করতে চায়। এ চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন শুধু প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নীতিগত সমর্থন এবং সম্পদের সঠিক বণ্টন।
সূত্র: বণিক বার্তা

