সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে ২০৩৪ সাল নাগাদ ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে।
এই পরিকল্পনায় অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ানো, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, বরং বিনিময় হারজনিত প্রভাব। অর্থাৎ, অর্থনীতি কত দ্রুত বড় হচ্ছে তার পাশাপাশি ডলারের হিসাবে সেই প্রবৃদ্ধি কতটা স্থিতিশীলভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এ লক্ষ্যটি নিয়ে আগেই আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার একটি লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই ঘোষণাকে ঘিরে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনসমর্থন ও আসন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেয়েছে।
সরকার এখন সেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা রাজনৈতিক স্লোগানকে একটি বাস্তব নীতিগত কাঠামোয় রূপ দিতে চাইছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, কাগজে-কলমে এই লক্ষ্য যতটা সহজভাবে উপস্থাপিত হয়, বাস্তব অর্থনীতিতে এটি অর্জন করা ততটাই জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের বিষয়।
ডলারের হিসাবে জিডিপি কোনো একক সূচকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর পেছনে কাজ করে তিনটি মূল উপাদান—প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধি বা রিয়েল আউটপুট গ্রোথ, মুদ্রাস্ফীতি এবং টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার আনুমানিক ৪৭০ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ককে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে নিতে হলে প্রয়োজন হবে বছরে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ ডলারভিত্তিক প্রবৃদ্ধি।
অর্থনৈতিক হিসাব বলছে, যদি প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭ শতাংশের মধ্যে থাকে, তাহলে স্থানীয় মুদ্রায় নামমাত্র প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ১২ শতাংশ। কিন্তু এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত হয়—ডলারের বিপরীতে টাকার মান। ধরা যাক, প্রতি বছর টাকার মান ৩ শতাংশ কমে যায়। তাহলে সেই হার হিসাব থেকে বাদ দিলে ডলারের হিসাবে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি নেমে আসে প্রায় ৯ শতাংশে। যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ দেশীয় অর্থনীতি বাস্তবে বড় হলেও, মুদ্রার অবমূল্যায়ন সেই অর্জনকে ডলারের হিসাবে ক্ষয় করে দিতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এক পর্যায়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারে পৌঁছায়। পরে দুই সপ্তাহের এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির ফলে তা কিছুটা কমে ৯৪ ডলারের কাছাকাছি নামে। তবুও এই দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এই উচ্চ দামে জ্বালানি আমদানির ব্যয় ইতোমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, পাশাপাশি পরিবহন ও বিদ্যুৎ খরচও বাড়ছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থায় কিছু পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে অর্থবছর শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে। এতে ফেব্রুয়ারির শুরুতে রিজার্ভ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলারে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো।
গত কয়েক মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। ফলে বাজারে টাকার মান বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছিল। বাজারের স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিলে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই পরিস্থিতিতে প্রতি ডলার প্রায় ১২২ টাকার কাছাকাছি বিনিময় হার ধরে রাখতে ডলার কেনা অব্যাহত রাখে। পরে ৮ মার্চ থেকে ধীরে ধীরে টাকার মান কিছুটা দুর্বল হতে দেওয়া হয়, কারণ বৈশ্বিক যুদ্ধঝুঁকি ও আমদানি ব্যয়ের চাপ স্পষ্ট হতে থাকে। বর্তমানে ডলারের দর প্রায় ১২৩ টাকার কাছাকাছি।
এই পরিবর্তনই ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে একটি মৌলিক দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে। একদিকে রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য ডলার কেনা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৪ বিলিয়নে নেমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করেছে।
অন্যদিকে, টাকার মান দুর্বল রাখা রপ্তানিকারকদের জন্য সহায়ক হলেও ডলারের হিসাবে বড় অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে বাধা তৈরি করে। ফলে একই নীতি একদিকে রিজার্ভকে শক্তিশালী করছে, আবার অন্যদিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য থেকে অর্থনীতিকে কিছুটা দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
সমস্যাটির মূল চরিত্র আসলে একক নয়, বরং এটি ত্রিমুখী। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, কোনো দেশ একসঙ্গে তিনটি লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারে না। একদিকে দুর্বল টাকার সুবিধা আছে। এটি রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ডলার কেনাও সহজ করে।
অন্যদিকে শক্তিশালী টাকার একটি ভিন্ন সুবিধা রয়েছে। এতে একই পরিমাণ উৎপাদন ডলারে রূপান্তর করলে অর্থনীতির আকার কাগজে-কলমে বড় দেখায়। ফলে ডলারের হিসাবে জিডিপি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এর বিপরীতে রপ্তানির মুনাফা সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা শিল্পখাতের ওপর চাপ তৈরি করে।
আরেকটি দিক হলো রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা। রিজার্ভ বাড়াতে বাজার থেকে ডলার কিনতে হলে স্থানীয় মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে, যা আবার টাকার মান দুর্বল করে দেয়। ফলে একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন বাড়ে। এই তিনটি উদ্দেশ্য—রিজার্ভের পর্যাপ্ততা, রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং ১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি লক্ষ্য—বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণকে তিনটি ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী দিকে টেনে নেয়। বাস্তবতায় একসঙ্গে তিনটি লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়; সাধারণত দুটি অগ্রাধিকার পায়, আর একটি কিছুটা ছাড় দিতে হয়। অর্থনীতিতে এটিকেই বলা হয় ‘ত্রয়ী সংকট’ বা ট্রিলেমা। বিনিময় হার নীতির কেন্দ্রে এই সীমাবদ্ধতাই বারবার সামনে আসে।
যদি উৎপাদনশীলতার শক্তিশালী ও ধারাবাহিক উন্নয়ন ঘটত, তাহলে এই চাপ অনেকটাই কমে যেত। কারণ তখন টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী থাকলেও রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারতেন। কিন্তু সেই ধরনের শিল্পোন্নয়ন ও কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বিএনপির ইশতাহারে এই বিনিময়জনিত টানাপড়েন বা ট্রেড-অফ সরাসরি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যদিও সেখানে রপ্তানি, রিজার্ভ এবং বড় অর্থনীতির লক্ষ্য—সবকিছুরই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয়—এমন নয়। বরং বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝে পরিকল্পনা করা হলে এটি ধাপে ধাপে অর্জনযোগ্য।
যদি বাংলাদেশ গত দশকের মতো প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে পারে এবং সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার ধীর অবমূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এরপর আরও এক বা দুই বছরের ব্যবধানে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমাও অতিক্রম করা সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতে এই ত্রিমুখী সংকট বা ‘ট্রিলেমা’ কীভাবে সামলানো হবে, তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পথচলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হার নীতি এখানে বড় ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে যে নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে—টাকার মান ধীরে ধীরে ও পূর্বানুমানযোগ্যভাবে কমতে দেওয়া—অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে সেটিই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পথ। এই পদ্ধতি একদিকে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রাখে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি হঠাৎ করে কোনো বড় ধরনের মুদ্রা সংকট তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও কমায়।
তবে এই নীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ধীরে ধীরে চলমান অবমূল্যায়নের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডলারের হিসাবে অর্থনীতির আকার বা জিডিপি কিছুটা সংকুচিত হতে পারে। অর্থাৎ, স্থানীয় মুদ্রায় প্রবৃদ্ধি হলেও ডলারের পরিমাপে তা তুলনামূলকভাবে কম দেখাতে পারে। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়ে আছে। তাদের স্পষ্ট করতে হবে—এই তিনটি লক্ষ্য অর্থাৎ রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা এবং ডলারের হিসাবে বড় অর্থনীতি গড়ে তোলা—এর মধ্যে কোনটি অগ্রাধিকার পাবে এবং কোনটি কিছুটা ছাড় পাবে।
১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় একটি ধারণা হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি এখনো শক্ত নীতিগত ভিত্তির ওপর পুরোপুরি দাঁড়ায়নি। কারণ বাস্তব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। মূল ফোকাস হওয়া উচিত মৌলিক কাঠামোগত বিষয়গুলোতে—স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং পর্যাপ্ত বৈদেশিক রিজার্ভ নিশ্চিত করা। এসব ভিত্তি শক্ত হলে ডলারের হিসাবে জিডিপি এমনিতেই বাড়বে।
এই হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা হয়তো ২০৩৪ থেকে এক-দুই বছর পিছিয়ে ২০৩৫ সালেও যেতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি কোনো ব্যর্থতা নয়। বরং এটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সমন্বয়, যেখানে লক্ষ্য নয়—গুরুত্বপূর্ণ হয় টেকসই ভিত্তি।
শেষ পর্যন্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কোনো জাদুকরি সংখ্যা নয়—এটি এক ধরনের আয়না, যেখানে অর্থনীতির বাস্তব শক্তি যেমন প্রতিফলিত হয়, তেমনি তার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রবৃদ্ধির গতি, মুদ্রার মান, রপ্তানির সক্ষমতা আর রিজার্ভের ভারসাম্য—এই চারটি সুতো যদি একসঙ্গে না বাঁধা যায়, তাহলে সবচেয়ে উজ্জ্বল লক্ষ্যও কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন আসল পরীক্ষা সংখ্যার নয়, সমন্বয়ের। কারণ ডলারের হিসাব কোনো স্বপ্ন দেখে না—সে শুধু বাস্তবতার হিসাব রাখে। আর সেই বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, সেটিকেই ঠিক করে দেয় ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মানচিত্র। শেষ প্রশ্নটা তাই খুব সরল, কিন্তু উত্তরটা নয়—আমরা কি সংখ্যাকে বড় করব, নাকি সংখ্যার ভিতকে শক্ত করব?
সিভি/এম