দেশের কর ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করতে এবার গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। লক্ষ্য হলো, জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ব্যবসাগুলোকে করের আওতায় আনা এবং দেশের কম কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন কিছু নীতিমালা যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এনবিআরের পরিকল্পনায় ছোট ব্যবসার জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে একটি নির্ধারিত বা “টোকেন” ভ্যাট চালুর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তাই এই উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়েও কর কাঠামো সম্প্রসারণ করতে চায় সরকার।
একজন ঊর্ধ্বতন এনবিআর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ভ্যাট কাভারেজ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। শুরুতে ছোট নির্দিষ্ট ভ্যাট দিলে ব্যবসায়ীরা কর ব্যবস্থার সঙ্গে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হবে।”
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বাজেট আলোচনায় ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে নির্দিষ্ট খাতে সীমিত ভ্যাট চালু করে করের আওতা বাড়ানো হতে পারে। কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তার শর্ত অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। এ কারণে কর অব্যাহতি কমানো এবং নতুন করদাতা যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
যদিও উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে, তবে হঠাৎ করে সব গ্রামীণ ব্যবসার ওপর একসঙ্গে ভ্যাট আরোপের বিষয়ে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ছোট ব্যবসা থেকে সীমিত ভ্যাট সংগ্রহ সম্ভব হলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও অতিরিক্ত খরচ যেন না বাড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের বড় একটি অর্থনৈতিক অংশ এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে। তবে এটি ধাপে ধাপে ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা উচিত।
আগে চালু থাকা “প্যাকেজ ভ্যাট” ব্যবস্থার মতো একই ধরনের কোনো পদ্ধতি আবার চালু হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক এনবিআর সদস্যরা। তাদের মতে, শক্ত নজরদারি ছাড়া এই ধরনের ব্যবস্থা আবারও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
চলতি অর্থবছরের মার্চে রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয়েছে। তবে ভ্যাট ও আয়কর খাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ৯ মাসে রাজস্ব আয় আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে রয়েছে। চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৯৭ লাখ কোটি টাকা। আগামী বছরে এই লক্ষ্য আরও বাড়তে পারে, তাই নতুন উৎস খোঁজার দিকে জোর দিচ্ছে এনবিআর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ অনুযায়ী দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট এখন ১ কোটি ১৭ লাখ। এর মধ্যে ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। কিন্তু এই বড় অর্থনীতি কর ব্যবস্থায় পুরোপুরি প্রতিফলিত নয়। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ ব্যবসা BIN নিয়েছে, তবে এর মধ্যে মাত্র ৫ লাখ ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয়। এনবিআরের মতে, বাস্তবে অন্তত ১ কোটি ব্যবসাকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব।
এনবিআরের এই পরিকল্পনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরই এটি বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, করের ভিত্তি বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি তা ধীরে ও পরিকল্পিতভাবে করা না হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

