বাংলাদেশে ইসলামী অর্থায়নের নতুন একটি মাধ্যম হিসেবে সুকুক কর্মসূচি ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে যাত্রা শুরু করে। শুরু থেকেই এটিকে দেশের আর্থিক খাতে একটি বিকল্প ও আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থার সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এটি প্রচলিত ঋণের বাইরে একটি কার্যকর অর্থায়ন মাধ্যম হতে পারে—এমন প্রত্যাশা ছিল নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।
প্রায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে এসে সেই প্রত্যাশার বড় একটি অংশ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, সুকুক আর শুধু পরীক্ষামূলক কোনো উদ্যোগ নয়; বরং এটি এখন রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
তবে এই অগ্রগতির মধ্যেই নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাংলাদেশ কি সুকুককে প্রকৃত উন্নয়ন অর্থায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, নাকি এটি কেবল প্রচলিত সরকারি ঋণের একটি ‘ইসলামী রূপান্তর’ হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে?
ঋণ প্রবাহ ও সুকুকের অবস্থান:
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জানুয়ারির সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সরকারের মোট নিট অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬ কোটি টাকা। এটি বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ।
গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৯২৩ দশমিক ৬ কোটি টাকায়। ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থায় চাপও বাড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই প্রেক্ষাপটে সুকুকের গুরুত্বও বাড়তে শুরু করেছে। সরকারি বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক (বিজিআইএস) দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এটি এখন সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে।
সুকুকের মাধ্যমে সরকারের অর্থ সংগ্রহের এই প্রবণতা একদিকে যেমন বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি এটি প্রচলিত ঋণ কাঠামোরই একটি নতুন রূপ হয়ে উঠছে কি না—সে প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
নীতিগতভাবে সুকুকের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন অর্থায়ন এবং সম্পদ-সমর্থিত বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে এটি যদি সাধারণ বাজেট ঘাটতি পূরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এর মৌলিক দর্শন দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে সুকুক এখন একটি প্রতিষ্ঠিত আর্থিক উপকরণে পরিণত হলেও এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—এটি কতটা স্বচ্ছ, প্রকল্পভিত্তিক এবং বাস্তব উন্নয়নমুখী কাঠামোতে ব্যবহৃত হয় তার ওপর।
রেভিনিউ সুকুক বনাম জেনারেল-পারপাজ সুকুক: বাংলাদেশের সুকুক কাঠামোর মৌলিক বিতর্ক:
বাংলাদেশের সুকুক বাজার এখন আর কেবল একটি বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার আলোচনা নয়, বরং এর ভেতরকার কাঠামো নিয়েই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সুকুকের দুটি ভিন্ন রূপ—রেভিনিউ সুকুক এবং জেনারেল-পারপাজ সুকুক—এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। নীতিগতভাবে এই দুই ধরনের সুকুকের উদ্দেশ্য, ব্যবহার ও অর্থনৈতিক প্রভাব একে অপরের থেকে আলাদা।
রেভিনিউ সুকুক:
রেভিনিউ সুকুক মূলত নির্দিষ্ট কোনো উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়। যেমন টোল রোড, বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বা পানি সরবরাহ ব্যবস্থার মতো অবকাঠামো। এই কাঠামোতে সংগ্রহ করা অর্থ সরাসরি ওই প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়।
এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প থেকে উৎপন্ন আয়ের একটি অংশের অধিকারী হন। ফলে সুকুক শুধুমাত্র অর্থ সংগ্রহের উপকরণ হিসেবে কাজ করে না, বরং এটি সরাসরি বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে অর্থাৎ, এখানে অর্থায়ন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
জেনারেল-পারপাজ সুকুকের বাস্তবতা:
অন্যদিকে জেনারেল-পারপাজ সুকুকের কাঠামো ভিন্ন। এই ধরনের সুকুকে বিদ্যমান সম্পদের বিপরীতে অর্থ সংগ্রহ করা হয় এবং তা সরকারের সাধারণ ব্যয় খাতে ব্যবহার করা হয়। এখানে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প থেকে আয়ের সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের সরাসরি সম্পর্ক থাকে না। বাস্তবে এটি অনেকটা প্রচলিত সরকারি বন্ডের মতোই আচরণ করে। অর্থাৎ, অর্থের ব্যবহার আরও বিস্তৃত এবং সাধারণ বাজেট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।
এই দুই ধরনের সুকুকের পার্থক্য কেবল প্রযুক্তিগত বা কাঠামোগত নয়। বরং এটি সুকুকের মূল দর্শন ও উদ্দেশ্যকেও আলাদা করে দেয়। রেভিনিউ সুকুক যেখানে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন ও বাস্তব অর্থনৈতিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে জেনারেল-পারপাজ সুকুক বেশি মাত্রায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বাজেট সমর্থনের উপকরণ হিসেবে কাজ করে।
এই পার্থক্যের কারণেই সুকুককে ঘিরে চলমান বিতর্কটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশে সুকুক কি মূলত উন্নয়ন অর্থায়নের একটি স্বচ্ছ ও উৎপাদনমুখী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার একটি বিকল্প কাঠামোতে রূপ নিচ্ছে?
বাংলাদেশে সুকুক চালুর শুরুটা হয়েছিল উন্নয়ন অর্থায়নের একটি বিকল্প ও উদ্ভাবনী পথ হিসেবে। প্রথম দিকের ইস্যুগুলোতে যে লক্ষ্য সামনে ছিল, তা ছিল তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট—অবকাঠামো ও সামাজিক খাতে সরাসরি বিনিয়োগ।
নিরাপদ পানি সরবরাহ, প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো প্রকল্পে সুকুকের অর্থ ব্যবহার করা হয়। এসব উদ্যোগকে অর্থনীতিবিদরা প্রকৃত অর্থে রেভিনিউ-বেজড ফাইন্যান্সিংয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে অর্থ সরাসরি উৎপাদনশীল ও উন্নয়নমূলক প্রকল্পে যুক্ত ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই কাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। নতুন ‘স্পেশাল সুকুক-১’ এবং অন্যান্য ইস্যুতে বিদ্যমান সরকারি সম্পদ—যেমন আবাসন বা রেলওয়ে অবকাঠামো—ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নতুন কোনো উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। বরং আগের বিদ্যমান সম্পদের বিপরীতে নতুন অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা কার্যত ঋণ গ্রহণের একটি বিকল্প রূপ হিসেবে কাজ করছে।
ফলে ধীরে ধীরে সুকুকের প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। এটি উন্নয়ন অর্থায়নের হাতিয়ার থেকে সরে গিয়ে সাধারণ ঋণ ব্যবস্থার কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে বিশ্লেষণে উঠে আসছে।
ঋণ অর্থনীতিতে সুকুকের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা:
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকার প্রায় ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ করেছে। এই ঋণ প্রবাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন সুকুকের মাধ্যমে সংগৃহীত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা সামনে আসছে।
- প্রথমত, সুকুক এখন আর শুধুমাত্র একটি বিকল্প অর্থায়ন মাধ্যম নয়। এটি ধীরে ধীরে সরকারের মূলধারার ঋণ ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠছে।
- দ্বিতীয়ত, বাজার কাঠামো অত্যন্ত ব্যাংকনির্ভর। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোই প্রায় পুরো সুকুক ইস্যু গ্রহণ করছে। এতে প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক ও বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।
- তৃতীয়ত, সুকুকের রিটার্ন নির্ধারণে প্রকল্পের প্রকৃত আয়ের চেয়ে প্রচলিত সুদহারের প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। এটি সুকুকের কাঠামোগত উদ্দেশ্যের সঙ্গে একটি টানাপোড়েন তৈরি করছে।
এই সব প্রবণতা মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কাঠামোগতভাবে সুকুককে ইসলামী অর্থায়নের উপকরণ হিসেবে দেখা হলেও, এর অর্থনৈতিক আচরণ অনেকাংশে প্রচলিত বন্ডের মতোই হয়ে উঠছে। ফলে প্রশ্নটি আরও গভীর হচ্ছে—সুকুক কি সত্যিকারের উন্নয়নমুখী অর্থায়ন কাঠামো হিসেবে তার মূল লক্ষ্য ধরে রাখতে পারছে, নাকি এটি ধীরে ধীরে প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থারই একটি নতুন রূপে পরিণত হচ্ছে?
বাংলাদেশে সুকুকের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই এর প্রকৃতি নিয়ে মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসছে। মূল ধারণা অনুযায়ী সুকুক হওয়ার কথা ছিল সুদবিহীন, সম্পদভিত্তিক ও বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রমনির্ভর একটি অর্থায়ন ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে সেই কাঠামো কতটা বজায় থাকছে—এ নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় বিতর্ক।
সুকুকের মূল প্রতিশ্রুতি হলো এটি সুদনির্ভর নয়, বরং বাস্তব সম্পদের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। কিন্তু যখন একই রাষ্ট্র প্রকল্পের উদ্যোক্তা, সম্পদের মালিক এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্যারান্টর হিসেবেও কাজ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত ঝুঁকির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আরও জটিলতা তৈরি হয় তখন, যখন প্রকল্প থেকে আয় না এসে সাধারণ সরকারি বাজেট থেকে পরিশোধ করা হয়। এতে করে প্রশ্ন দাঁড়ায়—এটি কি সত্যিই সম্পদভিত্তিক ইসলামী অর্থায়ন, নাকি কেবল একটি ইসলামী লেবেলযুক্ত প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থা? এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকলে সুকুকের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুকুক ব্যবস্থার প্রয়োগে ভিন্নতা দেখা যায়। মালয়েশিয়া সুকুক বাজারে নেতৃত্ব অর্জন করেছে শক্তিশালী শারিয়াহ গভর্ন্যান্স এবং উদ্ভাবনী কাঠামোর মাধ্যমে। সেখানে সুকুক কেবল ঋণ ব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং সুসংগঠিত উন্নয়ন অর্থায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম।
ইন্দোনেশিয়া আবার সুকুককে সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষ করে তাদের ‘গ্রিন সুকুক’ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা সুকুককে একটি টেকসই অর্থায়ন হাতিয়ারে রূপ দিয়েছে। তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশে সাধারণ তহবিলভিত্তিক সুকুক ইস্যুর প্রবণতাও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে সুকুকের মূল সম্পদভিত্তিক চরিত্রকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে। একটি সহজ পথ হলো সুকুককে প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থার একটি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। অন্যটি তুলনামূলকভাবে কঠিন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পথ—সুকুককে প্রকৃত উন্নয়ন অর্থায়নের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত করা।
সুকুক বাজারকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করতে কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। প্রথমত, প্রকৃত সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সুকুককে নতুন বা আয়-উৎপাদনকারী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ও আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন শারিয়াহ তদারকি কাঠামো গঠন জরুরি, যাতে স্বচ্ছতা ও ধর্মীয় নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হয়।
তৃতীয়ত, গ্রিন ও সামাজিক সুকুক চালুর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে।
চতুর্থত, বিনিয়োগকারীর ভিত্তি বিস্তৃত করতে ব্যাংকের বাইরে পেনশন ফান্ড, বীমা প্রতিষ্ঠান, সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, কর কাঠামোয় সমতা আনা প্রয়োজন, যাতে সুকুক ও প্রচলিত বন্ডের মধ্যে বৈষম্য না থাকে।
ষষ্ঠত, সেকেন্ডারি মার্কেট উন্নয়নের মাধ্যমে সুকুকের তারল্য বাড়ানো জরুরি।
এছাড়া প্রকল্পের আয় ও পরিশোধ ব্যবস্থাকে সাধারণ বাজেট থেকে আলাদা রাখার জন্য রিং-ফেনসিং পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আওতায়। এই বাস্তবতা সুকুকের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। সঠিক নীতি প্রয়োগ হলে এটি উৎপাদনশীল খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের উৎস হতে পারে। কিন্তু যদি সুকুক কেবল নাম পরিবর্তন করে প্রচলিত ঋণের আরেকটি রূপে পরিণত হয়—যেখানে কাঠামো ইসলামী কিন্তু বাস্তবতা প্রচলিত—তাহলে এটি তার মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। এই ঋণের বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে সুকুকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি যেন সত্যিকার অর্থে সম্পদভিত্তিক, শরিয়াহসম্মত এবং অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল কাঠামোতে পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশের সুকুক বাজার এখন একটি সিদ্ধান্তমূলক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। সঠিক নীতি ও সংস্কার এটিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি কার্যকর মডেলে রূপ দিতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল সরকারি ঋণের আরেকটি বিকল্প নাম হিসেবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
সুকুক এখন আর কেবল একটি অর্থায়নের মাধ্যম নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতির ভেতরের এক বাস্তব পরীক্ষা। শুরুতে যেটি ছিল উন্নয়ননির্ভর ও সম্পদভিত্তিক বিকল্প কাঠামোর প্রতিশ্রুতি, সময়ের সঙ্গে তার প্রয়োগে সেই লক্ষ্য কতটা অক্ষুণ্ন আছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে। সবচেয়ে বড় সংশয় একটাই—সুকুক কি সত্যিই নতুন অর্থনৈতিক পথ তৈরি করছে, নাকি পুরনো ঋণ ব্যবস্থাকেই নতুন নামে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে?

