আগামী জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশে কার্যরত বিদেশি বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলো স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, দ্রুত ও জটিলতামুক্ত প্রশাসনিক সেবা, উন্নত অবকাঠামো, কার্যকর বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং কর–শুল্ক কাঠামোর সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণ টেকসই হবে না।
এই দাবিগুলো ইতোমধ্যে তারা অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য জমা দিয়েছে। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) তাদের বাজেট প্রস্তাবে স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে।
সংগঠনটি ব্যক্তিগত কর ব্যবস্থায় করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো এবং নিম্নআয়ের কর কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, উচ্চ উৎসে করহার এবং ব্যয়ের বড় অংশ অগ্রহণযোগ্য ঘোষণার কারণে প্রকৃত করহার অনেক ক্ষেত্রে আইনি হারের চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় উৎসে করহার যৌক্তিক করার পাশাপাশি প্রকৃত করদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার দাবি জানিয়েছে তারা।
ভ্যাট ব্যবস্থাতেও জটিলতার কথা তুলে ধরে ফিকি জানিয়েছে, প্রশাসনিক কঠোরতা ও বিধির ব্যাখ্যাগত জটিলতায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বৈধ ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট পাচ্ছে না। এতে কার্যকর মূলধনের ওপর চাপ বাড়ছে। সংগঠনটি ভ্যাট ক্রেডিট ব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাব মান অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য মুশক-৪.৩ জমা থেকে অব্যাহতির প্রস্তাব দিয়েছে।
কাস্টমস ব্যবস্থায় ২০০০ সালের ভ্যালুয়েশন রুলস অনুযায়ী লেনদেন মূল্য কঠোরভাবে অনুসরণের পাশাপাশি ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে প্রভিশনাল অ্যাসেসমেন্ট বাড়ানোর সুপারিশ করেছে তারা। একই সঙ্গে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) কার্যক্রম সহজ করার কথাও বলা হয়েছে। ফিকির সভাপতি রূপালী হক বলেন, “এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্বয়ংক্রিয়, মানসম্মত ও পূর্বানুমানযোগ্য কর ব্যবস্থা জরুরি।”
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে কার্ডভিত্তিক পেমেন্টে ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ৩ শতাংশ গ্রাহক এবং ২ শতাংশ ব্যবসায়ীরা পেতে পারেন বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটি দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি অনুযায়ী সরাসরি করহার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোকে আলাদাভাবে সনদ সংগ্রহ করতে হবে না বলে তারা মনে করে।
উৎসে কর কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাবেও বলা হয়েছে, করপোরেট কর নির্ধারণ অনুযায়ী উৎসে কর ৪.১২৫ শতাংশ এবং অন্য ক্ষেত্রে ৫.২৫ শতাংশ হতে পারে। ব্যাংকিং খাতে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান করহার ৩৭.৫ শতাংশ বজায় রাখার সুপারিশও রয়েছে।
এছাড়া স্মার্টকার্ড ও পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিনে শুল্ক ১৫ শতাংশের নিচে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কার্বনেটেড পানীয়র সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার সুপারিশও দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, তৈরি পোশাক খাতের বর্জ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতির আওতায় আনলে পুনর্ব্যবহার শিল্প শক্তিশালী হবে।
অ্যামচ্যামের যুগ্ম সচিব সানোয়ার হোসেন বলেন, ব্যাংকিং খাতে সমতা নিশ্চিত করতে সমান করহার বজায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে শূন্য থেকে ২০ শতাংশ হারে কর সুবিধা দিলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিসিসিসিআই) ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার ২০ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের ওপর সারচার্জ মওকুফের সুপারিশ করেছে তারা। গার্মেন্টস শিল্পে ৫০ শতাংশ কাঁচামাল দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করার কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব করনীতি, প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংগঠনটি এনবিআরের ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) সিম ও ই-সিম সরবরাহ ও প্রতিস্থাপনে ৩০০ টাকা ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। সংগঠনটি তরঙ্গ বরাদ্দে ভ্যাট আরোপ এবং পরে সেবা প্রদানের সময় আবার ভ্যাট আদায়কে ‘দ্বৈত কর’ হিসেবে উল্লেখ করে এর অবসান চেয়েছে।
বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের মোট আয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ ভ্যাট ও কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয় বলে তারা জানিয়েছে। তাদের মতে, এতে খাতে বিনিয়োগ ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে। টেলিযোগাযোগ সেবায় থাকা ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১ শতাংশ সারচার্জ প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। গ্রাহকপ্রতি গড় আয় ১৫০ টাকার নিচে থাকায় দীর্ঘমেয়াদে খাতের টেকসইতা ঝুঁকিতে পড়ছে বলেও তারা সতর্ক করেছে।
সব মিলিয়ে বিদেশি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলো বাজেটে কর কাঠামো সহজীকরণ, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস, ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে।
সিভি/এম

