এক দশকেরও বেশি আগে নোবেল বিজয়ী স্টিভেন চু একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে বলেছিলেন, পাথরের যুগ পাথরের অভাবে শেষ হয়নি; বরং মানুষ তার চেয়ে ভালো সমাধান খুঁজে নিয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি দক্ষতা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সেই উন্নত সমাধানেরই অংশ, যা একটি পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য অপরিহার্য।
এই ধারণা শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে মূল্য ও সরবরাহজনিত ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ, যেখানে প্রাথমিক জ্বালানির ৬২ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়, সেখানে জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজন আরও তীব্র।
২০২২ সালের রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম একাধিকবার বাড়ানো হলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। এতে ভর্তুকির চাপও বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে জনগণ, শিল্প ও ব্যবসা খাতে।
চার বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। বরং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরু হওয়ার পরও স্পষ্ট হয়েছে, প্রচলিত জ্বালানি ব্যবস্থার বাইরে না গেলে এই খাতের স্থিতিশীল ও টেকসই রূপান্তর সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যাত্রা শুরু হয়েছিল সোলার হোম সিস্টেম দিয়ে, যা কিছুটা সফলতাও দেখিয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই খাত ধীরগতিতে এগিয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। দেশটি কৃষিনির্ভর ও ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় জমি নিয়ে শঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। আবার সৌর ঘণ্টা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে বাস্তবতা হলো, সীমাবদ্ধতা থাকলেও সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রয়োজনীয় জমি একেবারেই নেই—এমন বলা যায় না।
বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বরাদ্দকৃত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, সেচ ব্যবস্থায় সৌর শক্তির ব্যবহার এবং দেশের ৮৭ হাজার গ্রামে ছোট পরিসরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে সৌর ঘণ্টার দিক থেকে ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকায় উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেশি। তবুও অর্থনৈতিকভাবে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তির খরচ কমে আসায় রাতের সময়েও নবায়নযোগ্য উৎস ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে ১০ হাজার ৮৬০ গিগাওয়াট-আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এতে প্রতি ইউনিটে জ্বালানি খরচ ১৬ টাকার বেশি হয়েছে। শুল্ক বাদ দিলেও খরচ দাঁড়ায় ১২.৫ টাকার ওপরে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উৎপাদনের ৮০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা গেলে বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার ফার্নেস অয়েল আমদানি সাশ্রয় করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক শক্তি গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ১ শতাংশেরও কম। অথচ বাংলাদেশে গত অর্থবছরে প্রায় ১১ শতাংশ বিদ্যুৎ এসেছে তেলভিত্তিক উৎস থেকে, যা হ্রাস করা জরুরি।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এখনো পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার হয়নি। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে স্থাপিত সক্ষমতা ৩১৬ মেগাওয়াট হলেও শিল্প খাতে এটি ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হতে পারে। সেচ খাতে এক মিলিয়নের বেশি ডিজেলচালিত পাম্প রয়েছে। এগুলো সৌরচালিত পাম্পে রূপান্তর করা গেলে বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ডিজেল আমদানি সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি গ্রিড সংযোগ থাকলে সারা বছর এই বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। বায়ুবিদ্যুৎ, বিশেষ করে অফশোর উইন্ড পাওয়ার, সম্ভাবনাময় হলেও এ ক্ষেত্রে আরও বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন। বায়োগ্যাসসহ অন্যান্য উৎসও জ্বালানি রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০১৪–১৫ থেকে ২০২৩–২৪ সময়কালে বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৫২ শতাংশ। এলইডি বাতি ও ইনভার্টারযুক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও সম্ভাবনা এখনো অনেক। শিল্প খাতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। পুরনো মোটর পরিবর্তন, বর্জ্য তাপ ব্যবহার এবং দক্ষ বয়লার ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। স্রেডা চিহ্নিত ১৮৯টি প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি নিরীক্ষার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে অগ্রগতি দ্রুত হতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো উচ্চ আমদানি শুল্ক। সৌর যন্ত্রাংশে ২৮.৭৩ থেকে ৬১.৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে, যা প্রকল্প ব্যয় বাড়ায়। জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রাংশেও উচ্চ কর আরোপ রয়েছে। এসব শুল্ক হ্রাস বা বাতিল করলে খাতটি দ্রুত বিকাশ লাভ করবে। পাশাপাশি নিট-মিটারিং ব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা দূর করাও জরুরি। সংযোগ প্রক্রিয়া সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হলে বিনিয়োগ বাড়বে।
গার্মেন্টস ও টেলিকম খাতসহ বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতার দিকে ঝুঁকছে। তবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। মার্চেন্ট পাওয়ার প্লান্ট নীতিমালা ২০২৫ এই ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে হুইলিং চার্জ ও অন্যান্য ব্যয় বেশি হলে প্রকল্পগুলো অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ১০ টাকা খরচ হয়। অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত হলে এটি শিল্পের গ্রিড বিদ্যুতের চেয়েও ব্যয়বহুল হয়ে যায়। তাই নীতিগত ভারসাম্য জরুরি।
সরকার ইতোমধ্যে পিপিপি ভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের নির্দেশিকা তৈরি করেছে এবং সরকারি জমি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। তবে জমি লিজ, ট্যারিফ নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সময়সীমা না থাকলে অগ্রগতি ধীর হবে। গ্রিড আধুনিকায়ন ছাড়া জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ ও সমন্বিত পরিকল্পনা।
বাংলাদেশে জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সমন্বিত উদ্যোগ। একই সঙ্গে দরকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষ প্রযুক্তি দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে পারে।
- শফিকুল আলম: ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসে (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক হিসেবে কর্মরত।

