উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর সমরখন্দে চলছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর ৫৯তম বার্ষিক সম্মেলন। এই আন্তর্জাতিক আয়োজন ঘিরে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা একত্র হয়েছেন। এতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্ডার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশ ও এডিবির মধ্যে চলমান সহযোগিতা, ভবিষ্যৎ সহায়তার সম্ভাবনা এবং পারস্পরিক অগ্রাধিকার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।
পরে সমরখন্দের কংগ্রেস সেন্টারে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে বাজেট সহায়তা, কারিগরি সহযোগিতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়। এ সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ দেখছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে উন্নয়ন সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর দিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
শুরুতেই জানতে চাই, এডিবির এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রত্যাশা, বাজেট সহায়তাসহ অন্যান্য খাত নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে?
প্রথমত, এডিবি নতুন সরকারকে এত বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা এবং জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছে। দ্বিতীয়ত, খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমান বিএনপি সরকারের ইশতাহার, অর্থাৎ আমরা জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তার প্রতি এডিবির পুরোপুরি সমর্থন রয়েছে। সহায়তার বিষয়ে তারা বাজেট সহায়তা হিসেবে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যেই পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে এ সহায়তা আরো বাড়তে পারে। এছাড়া প্রকল্প সহায়তা হিসেবে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা এ অর্থবছরের জন্য। এটিও ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আলোচনা করে বাড়তে পারে।
আর কোন কোন খাতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এডিবি?
সহায়তা বলতে এখানে এরিয়া অব কো-অপারেশন, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের সহযোগিতার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে এডিবির সঙ্গে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্ভবত তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে এ খাতে আমাদের সহায়তা করবে, বিশেষ করে যেসব দেশ ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে কাজ করতে আগ্রহী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এডিবি কিংবা অন্য সংস্থা বা দেশ সহায়তা করবে কি?
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিয়ে এডিবির বেশ আগ্রহ রয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তারা সহায়তা করতে আগ্রহী। শুধু এডিবিই নয়, কিছু দেশ যেমন জার্মানিও আগ্রহ দেখিয়েছে এবং এ প্রকল্পে তাদের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ভবিষ্যতে এখানে একটি বড় পোর্টফোলিও তৈরি হবে বলে আমরা আশা করছি। ক্লাইমেট (জলবায়ু) ইস্যু বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় জার্মানির আগ্রহও বেড়েছে। তারা ক্লাইমেট-ফ্রেন্ডলি প্রকল্পে কাজ করছে, যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অন্যতম। এ খাতে আমরা বড় ধরনের সহযোগিতা পাওয়ার আশা করছি।
ক্যাপিটাল মার্কেট সংস্কারের বিষয়ে এডিবির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। বাংলাদেশ এ খাতে কী ধরনের উন্নয়ন করতে চায়?
ক্যাপিটাল মার্কেটে আমরা তাদের কারিগরি সহায়তা চেয়েছি। কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সে সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। এখানে মূলত অর্থের চেয়ে টেকনিক্যাল সাপোর্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে পারি এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করতে পারি, তাহলে বাকি উন্নয়ন আমরা কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে করতে পারব। দীর্ঘদিন ধরে আমরা ডি-রেগুলেশনের কথা বলছি—এখানে একটি সিরিয়াস ডি-রেগুলেশন দরকার। আমরা যখন ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মার্কেটে যাওয়ার লক্ষ্য নিচ্ছি, এ জায়গাটায় এডিবির সহায়তা আসবে মূলত। বাকি কাজ তো আমাদের সরকারকে করতে হবে। ইনশা আল্লাহ আমরা এ বিষয়ে এগিয়ে যাব।
জলবায়ু তহবিল নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি?
হ্যাঁ, ক্লাইমেট ফান্ড নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশ এ ফান্ড যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারেনি—এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আমরা বর্তমানে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননসহ বিভিন্ন ক্লাইমেট-সম্পর্কিত প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এসব প্রকল্পে তাদের সমর্থন থাকবে, কারণ এটি তাদেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার খাত।
নর্থ-ওয়েস্ট ঢাকা সাউথ-ইস্ট ইন্টিগ্রেটেড রোড নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট সম্পর্কে জানতে চাই। বিষয়টি নিয়েও তো আলোচনা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
এটি একটি ইন্টিগ্রেটেড প্রজেক্ট (সমন্বিত প্রকল্প)। দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে গ্রোথ সেন্টারগুলো রয়েছে, সেগুলোকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। যেমন বগুড়ায় লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্ভাবনা আছে, অন্যান্য অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব শক্তিকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা এডিবির সঙ্গে যৌথভাবে এ প্রকল্প এগিয়ে নিতে চাই। আশা করছি, এডিবি প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরে গেলে এটি চূড়ান্ত হবে। আমরা চেষ্টা করব বিষয়টি তখন ঘোষণা করার।
আইএমএফের অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলমান। এ নিয়ে অগ্রগতি কী?
আলোচনা চলছে। আলোচনার সফল সমাপ্তির জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। আমি আগেই বলেছি, আমাদের দেশের ও জনগণের স্বার্থই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একটি নির্বাচিত সরকার, তাই জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই আলোচনা এগোচ্ছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
বাজেট সামনে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি আপনার প্রথম বাজেট। এবারের বাজেটে কী চমক থাকছে?
আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাজেট প্রস্তুত করতে হচ্ছে—প্রায় দুই-আড়াই মাসের মধ্যে। এর মধ্যে এক মাস কার্যত ট্রানজিশনে কেটে গেছে। ফলে খুব অল্প সময়েই বাজেট তৈরি করা কঠিন কাজ। তাছাড়া আমরা যে অর্থনীতি পেয়েছি, তা বেশ দুর্বল অবস্থায় ছিল। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত সংকটও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়ন সহজ নয়। তবে এবারের বাজেটে দেশের প্রতিটি মানুষ ও সম্প্রদায়ের জন্য সহায়তা থাকবে।
অতীতে অনেক গোষ্ঠী বাজেটের বাইরে ছিল, তাদের জন্য কোনো প্রকল্প ছিল না। এবারের বাজেটে তাদের অন্তর্ভুক্ত করব। আমরা ডেমোক্রাটাইজেশন অব দ্য ইকোনমির (অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ) কথা বলেছি, এটা আমাদের স্লোগান। আর এটি বাস্তবায়ন করতে হলে সব গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং অর্থনৈতিক সুফল সবার ঘরে পৌঁছতে হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা বাজেট প্রণয়ন করছি। সূত্র: বণিক বার্তা
সিভি/এম

