আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। শুধু ভাতাভিত্তিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এবার পরিবারভিত্তিক সুরক্ষা, কৃষি সহায়তা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সম্মানি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং নগদ সহায়তাকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি সমন্বিত কল্যাণ কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি ৬৩ লাখে। এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। তুলনামূলকভাবে চলতি অর্থবছরে এই কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এ খাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২১ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে উপকারভোগী সংখ্যা ও বাজেট বরাদ্দ—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ দেখা যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে কেন্দ্র করেই সরকারের ‘কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা’র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরা হবে। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ফ্যামিলি কার্ড: সামাজিক নিরাপত্তার নতুন কেন্দ্র:
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোয় এখন সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হয়ে উঠেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে একটি একক পরিচয়ের আওতায় এনে নগদ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এই কর্মসূচির সূচনা। ধীরে ধীরে এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।
আগামী অর্থবছরে এই কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী সংখ্যা বাড়িয়ে ৪১ লাখ পরিবারে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাচ্ছে। এই হার অপরিবর্তিত থাকলেও উপকারভোগী বাড়ার কারণে শুধু এই খাতেই বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা।
তবে এই কর্মসূচিতে একটি বড় পরিবর্তন আসছে। ফ্যামিলি কার্ডধারীরা আর অন্য কোনো সামাজিক ভাতা পাবেন না। অর্থাৎ কেউ যদি বয়স্ক, বিধবা বা অন্যান্য ভাতার সুবিধা পান, তাহলে ফ্যামিলি কার্ড গ্রহণের পর সেই সুবিধা বাতিল হবে। সরকারের যুক্তি, এতে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কমবে এবং প্রকৃত দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্তি সহজ হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে এই কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পাঁচ বছরে এ খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই বৃহৎ কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ ও নির্ভুলভাবে করা হচ্ছে তার ওপর। অতীতের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও রয়েছে।
কৃষক কার্ডে ৪২ লাখ কৃষক:
গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উৎপাদন শক্তিশালী রাখতে কৃষকদের জন্যও পৃথক সহায়তা কাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের আওতায় থাকা কৃষকরা বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। এ খাতে সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। সরকারের ধারণা, কৃষকদের একটি ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরি হলে ভবিষ্যতে সার, বীজ, কৃষিঋণ ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো আরও সহজ হবে।
বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতায় পরিবর্তন:
সামাজিক নিরাপত্তার ঐতিহ্যগত তিনটি বড় খাত—বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাতেও আসছে পরিবর্তন। বর্তমানে ৬১ লাখ বয়স্ক নাগরিক মাসে ৬৫০ টাকা করে ভাতা পান। আগামী অর্থবছরে উপকারভোগী বেড়ে দাঁড়াবে ৬২ লাখে। একইসঙ্গে মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। তবে ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে, তারা মাসে ১ হাজার টাকা করে পাবেন।
বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ভাতাও ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে। তবে এই খাতে নতুন উপকারভোগী যুক্ত করা হচ্ছে না, কারণ অনেককে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় বর্তমানে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মাসে ৯০০ টাকা করে পাচ্ছেন। আগামী অর্থবছরে উপকারভোগী সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৬ লাখ করা হবে। তবে ভাতার হার অপরিবর্তিত থাকছে।

