আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আপাতত নেই। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার যে কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়ে গেছে, সেই কাঠামোই বহাল রাখার দিকে ঝুঁকছে নতুন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে নাগরিকদের আয়কর ব্যবস্থায় বড় কোনো ছাড় বা নতুন সুবিধা না এলেও করের বোঝা কিছু ক্ষেত্রে বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে করহার এবং আয়ের স্ল্যাব বা ধাপে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা থাকায় মধ্য ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করার দিকেও এগোচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।
আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ওইদিন বেলা ৩টায় অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাজেট প্রণয়নের কাজ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। বিভিন্ন প্রাক-বাজেট আলোচনায় পাওয়া প্রস্তাব, রাজস্ব আহরণের বাস্তবতা এবং সরকারের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আরও দফায় দফায় আলোচনা হবে।
বর্তমানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এই সীমাই বহাল রেখেছিল। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্থবছরের জন্য করহার কাঠামোও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়। ২০২৫ সালের ২ জুন বাজেট উপস্থাপনের সময় তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এই ঘোষণা দেন। এ অবস্থায় নতুন করে এই সীমা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনবিআরের বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে করমুক্ত সীমার পর একাধিক ধাপে কর দিতে হয়। প্রতিটি ধাপে করহার ৫ শতাংশ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে। আগামী বাজেটে এই কাঠামো আরও সরল করা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্ল্যাব সংখ্যা কমে ৭ থেকে ৬টি হতে পারে। তবে প্রতিটি স্তরে করহার প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এর ফলে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চ আয়ের করদাতারা সবাইকেই বাড়তি কর দিতে হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে দেখা গেছে, বর্তমানে একজন করদাতা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তুলনামূলক কম হারে কর দিলেও নতুন কাঠামোয় একই আয়ে করের পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর কাঠামোর এই পরিবর্তন বাস্তব আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না হলে সাধারণ করদাতাদের ওপর চাপ বাড়বে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকতে পারে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও পণ্যমূল্যের অস্থিরতা অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। তাই বাজেট প্রণয়নে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
তবে প্রথমবার কর রিটার্ন জমা দেওয়া করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। তাদের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ আয় অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হতে পারে। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য করভীতি কমানো এবং নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করা।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৩০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে সব প্রতিষ্ঠানের জন্য অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে এনবিআর।
নতুন বাজেটে ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন ও নবায়নে সিসিভেদে অগ্রিম আয়কর বাড়তে পারে। বর্তমানে এই হার ২৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ এবং হেলিকপ্টারের ওপরও অতিরিক্ত কর আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়ের সীমা অন্তত ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা উচিত। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান বলেন, মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আয় বিবেচনায় করমুক্ত সীমা ৫ লাখ টাকা করা দরকার। পাশাপাশি সিনিয়র সিটিজেন ও নারীদের জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমান কাঠামোতেই রাখা যুক্তিসঙ্গত। এতে বড় অংশের করদাতা কর নেটের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি বারবার পরিবর্তন হলে কর ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, করমুক্ত আয়সীমা এখন একটি স্থিতিশীল কাঠামোর মধ্যে আছে। আপাতত এটি পরিবর্তনের চাপ নেই।
সবশেষ সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর ওপর। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোই হবে আসন্ন বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—স্থিতিশীলতার নামে কি করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে, নাকি এটি রাজস্ব ব্যবস্থার নতুন রূপান্তর?
সিভি/এম

