দেশের নতুন আমদানি নীতিতে মেধাস্বত্ব সুরক্ষার কঠোর শর্ত যুক্ত হওয়ায় বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে নকল ও ক্লোন পণ্যের প্রবেশ কমে আসতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগামী তিন বছরের জন্য যে নতুন আমদানি নীতির খসড়া তৈরি করেছে, সেখানে প্রথমবারের মতো মেধাস্বত্বসংক্রান্ত শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ট্রেডমার্ক ও পেটেন্ট আইন মেনে পণ্য আনতে হবে। তবে ২০২১-২০২৪ সালের বিদ্যমান আমদানি নীতিতে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
নতুন শর্ত কার্যকর হলে বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানিতে আমদানিকারকদের রয়্যালটি পরিশোধ করতে হতে পারে। এতে ওষুধ, প্রযুক্তিপণ্যসহ বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে অনেকে মনে করছেন, এর ফলে নকল ও অননুমোদিত পণ্যের বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য আমদানি করতে হলে সংশ্লিষ্ট মেধাস্বত্বের বৈধ কাগজপত্র থাকতে হবে। ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯ এবং বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন ২০২৩ অনুযায়ী, ব্র্যান্ড মালিক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সম্মতি ছাড়া সেই পণ্য আমদানি করা যাবে না। এমনকি কোনো প্রযুক্তি বা উৎপাদনপ্রক্রিয়া বাংলাদেশে পেটেন্ট করা থাকলে পেটেন্ট মালিকের অনুমতি ছাড়া সেটিও আমদানি করা যাবে না।
খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পেটেন্ট করা ওষুধ আমদানির ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি দিতে হতে পারে। এ কারণে ওষুধ ও প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে অনেক আমদানিকারক বিদেশ থেকে আসল ব্র্যান্ডের পণ্য কিনে এনে দেশে বিক্রি করেন। কিন্তু নতুন নীতি কার্যকর হলে ব্র্যান্ড মালিক বা অনুমোদিত এজেন্টের অনুমতি ছাড়া পণ্য আমদানি করলে সেটিকে ‘মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন’ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কাস্টমস সন্দেহভাজন পণ্যের খালাসও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে পারবে।
এই নীতির ফলে বাজারে কপি বা ক্লোন পণ্যের প্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস ও প্রসাধনী পণ্যের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি বাড়বে। আমদানিকারকদের এখন ট্রেডমার্ক বা পেটেন্ট সনদ দেখিয়ে পণ্যের সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। ফলে অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে পণ্য আমদানির প্রবণতা বাড়বে এবং কিছু ক্ষেত্রে বাজারে একচেটিয়া প্রভাবও তৈরি হতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিকও দেখছেন অনেকে। তাঁদের মতে, এই নীতি কার্যকর হলে ভোক্তারা আসল পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন। পাশাপাশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অফিসিয়াল শোরুম চালু করতে আরও আগ্রহী হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি ট্রিপস বাস্তবায়নে বিশেষ ছাড় পেয়ে এসেছে। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সেই সুবিধা থাকার কথা নয়। তবে কম দামে ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ ২০২৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনে ২০৩২ সাল পর্যন্ত এই অব্যাহতি চেয়েছে।
নতুন আমদানি নীতিতে মেধাস্বত্বের কড়াকড়ি যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে ওষুধশিল্পে এই বাড়তি সুবিধা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আলী নওয়াজ জানান, মেধাস্বত্বের শর্ত নিয়ে ওষুধশিল্প মালিকদের সংগঠন ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, এখনই বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ এলডিসি সুবিধার কারণে বাংলাদেশ এখনও ওষুধশিল্পে পেটেন্ট আইনের কিছু বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পেটেন্ট করা নতুন ওষুধ তাদের অনুমতি ছাড়া আমদানি বা উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। তাই আগেভাগেই দেশের আইন ও নীতিমালায় মেধাস্বত্বের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

