বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সময় অতিক্রম করছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, বিশ্বায়ন এবং উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও বেকারত্ব এখনো একটি বড় ও স্থায়ী চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। উন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল অঞ্চলের মধ্যে বেকারত্বের ধরন ও মাত্রায় স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবে বিশ্বে বেকারত্বের হার বর্তমানে প্রায় ৪.৮ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে এটি প্রায় ২০ থেকে ২১ কোটি মানুষ অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১০০ জন কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় পাঁচ জন কাজ পাচ্ছে না। বিভিন্ন দেশে বেকারত্বের হার একেক রকম। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে তুলনামূলকভাবে হার কম হলেও সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ শতাংশ। জার্মানিতে প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ। ফ্রান্সে প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ। স্পেনে এই হার প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোতে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের হার কম দেখা গেলেও আংশিক বেকারত্ব বেশি। পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ভারতে বেকারত্বের হার প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ হলেও জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় বেকারের সংখ্যা অনেক বড়। পাকিস্তানে এই হার প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ। শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ। নেপালে বেকারত্বের হার প্রায় ১০ থেকে ১১ শতাংশ, যেখানে তরুণদের অংশ বেশি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে আফগানিস্তানে বেকারত্ব ১৩ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশে বেকারত্ব নিয়ে আলোচনা হলে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে। সরকারি হিসাবে হার তুলনামূলক কম দেখালেও বাস্তব চিত্রে ভিন্নতা রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেশে মোট বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৪ শতাংশ থেকে ৪.৭ শতাংশের মধ্যে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, চলমান অর্থনৈতিক চাপের কারণে এই হার ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সংখ্যার হিসাবে হার কম মনে হলেও বাস্তব প্রভাব অনেক গভীর।
বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ। এর মধ্যে বড় একটি অংশ শিক্ষিত তরুণ। যারা উচ্চশিক্ষা শেষ করেও উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে তরুণদের বেকারত্বের হার বিশ্লেষণ করলে। যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশ, যা মোট বেকারত্বের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে বাস্তব কর্মসংস্থানের সংকট আরও তীব্রভাবে ধরা পড়ে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব এখন শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এই সমস্যার পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ স্পষ্টভাবে কাজ করছে।
- প্রথমত, শিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থীই কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।
- দ্বিতীয়ত, শিল্প ও উৎপাদন খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ সীমিত থাকায় চাকরির সুযোগও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।
- তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়ে পড়ছে। ফলে বেকারত্ব কেবল সংখ্যাগত সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি গুণগত সংকট হিসেবেও সামনে আসছে।
এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো ‘গোপন বেকারত্ব’। অনেক মানুষ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের আয় খুব কম বা কাজ স্থায়ী নয়। ফলে তারা কার্যত পূর্ণ কর্মসংস্থানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। সমাজে অস্থিরতা বাড়লে অনেক সময় বেকারত্বকে প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনা হয়। ধারণা করা হয়, কাজ ও আয়ের অভাবে মানুষ অপরাধ বা রাজনৈতিক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ে। আংশিকভাবে এটি সত্য হলেও পূর্ণ সত্য নয়। কারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একক কোনো কারণে তৈরি হয় না। এটি বহু উপাদানের সম্মিলিত ফল।
দীর্ঘদিন কর্মহীনতা মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। আত্মসম্মান কমিয়ে দেয় এবং পারিবারিক সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একে ‘স্ট্রেইন থিওরি’ বা চাপজনিত প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ বৈধ পথে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হলে কিছু মানুষ বিকল্প ও কখনও অবৈধ পথে ঝুঁকে পড়তে পারে।
তবে এটি মনে রাখা জরুরি, সব বেকার মানুষ অপরাধে জড়ায় না। আবার সব অপরাধের পেছনে বেকারত্বই একমাত্র কারণ নয়। অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতার পেছনে আরও অনেক উপাদান কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল শাসনব্যবস্থা, আইনের অসম প্রয়োগ, রাজনৈতিক বিভাজন, মাদক বিস্তার, সামাজিক বৈষম্য এবং পারিবারিক ও শিক্ষাগত ঘাটতি। বেকারত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক চাপ। এটি কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। একজন বেকার মানুষের হতাশা ও অনিশ্চয়তা ধীরে ধীরে পরিবার ও সমাজেও প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। এই জনসংখ্যা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হিসেবে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে কিন্তু সীমিত কর্মসংস্থান সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে কর্মসংস্থানের বিষয়টি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, সরকারি চাকরির সুযোগ সব সময় সীমিত থাকবে। তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার সরাসরি সবাইকে চাকরি দিতে না পারলেও কর্মসংস্থান তৈরির পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে। অবকাঠামো উন্নয়ন—রাস্তা, বিদ্যুৎ, বন্দর—এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্কগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা গেলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো দক্ষতা উন্নয়ন। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে যে ফাঁক রয়েছে তা কমাতে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আইটি, মেশিন অপারেশন, ইলেকট্রনিক্স, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় বাজারেই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বেসরকারি খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্প ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই খাতকে আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে আইটি খাত, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এসব খাত নতুন কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে বের করে এনে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং ব্যবসা নিবন্ধনের জটিলতা কমানো নতুন উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো প্রবাসী শ্রমবাজার। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে পাঠানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের চাপও কমবে। তবে এর জন্য শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং অধিকার সুরক্ষা—দুই দিকই নিশ্চিত করা জরুরি।
ডিজিটাল অর্থনীতিও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স এবং অনলাইন সেবা খাতে তরুণরা ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পাচ্ছে। সরকার যদি ইন্টারনেট সুবিধা আরও উন্নত করে এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাড়ায়, তাহলে এই খাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কেবল অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয় নয়, এটি একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনেরও ভিত্তি। তাই শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে ন্যায়বিচার, সুযোগের সমতা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি সুশাসন ও সামাজিক আস্থার ভিত্তি শক্ত করা প্রয়োজন। কারণ আজকের বিশ্বে জনসংখ্যা আর মূল সমস্যা নয়; মূল সমস্যা হলো দক্ষতার অভাব এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা।
এই বাস্তবতায় আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিককে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে যুক্ত করা। “একজনও বেকার থাকবে না”—এই লক্ষ্য হয়তো একটি আদর্শিক ধারণা, তবে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই পরিকল্পনা, নীতি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে এগোতে হবে। শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই শেষ কথা নয়; প্রয়োজন মানসম্মত কর্মসংস্থান, যেখানে থাকবে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা। কারণ অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল কাজ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আমরা কি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি, যেখানে জন্ম নেওয়া প্রতিটি তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাবে? নাকি আমরা কেবল পরিসংখ্যানের ভেতরেই বেকারত্বকে আটকে রাখব, বাস্তব জীবনের চাপকে অস্বীকার করে।
তাই প্রশ্নটি এখন খুব সরল কিন্তু গভীর—আমরা কি কাজ সৃষ্টি করব, নাকি শুধু সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়েই সময় পার করব? কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যেসব সমাজ তার তরুণদের কাজ দিতে পেরেছে, তারাই এগিয়ে গেছে। আর যেসব সমাজ তা পারেনি, তারা থেমে গেছে সম্ভাবনার মাঝপথেই।
সিভি/এম

