বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস। সংস্থাটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিংয়ের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি বা আউটলুক ‘স্থিতিশীল’ থেকে পরিবর্তন করে ‘ঋণাত্মক’ করেছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান ‘বি প্লাস’ রেটিং অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
হংকং থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিচ জানিয়েছে, বাংলাদেশ এখনো ঋণ পরিশোধে সক্ষম হলেও অর্থনীতি বহিরাগত চাপের মুখে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ডিফল্ট রেটিং মূলত কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ সময় ধরে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা মূল্যায়ন করে। আর আউটলুক ‘ঋণাত্মক’ হওয়া মানে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়লে দেশের রেটিং কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদেশি ঋণের সুদ ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কমে যেতে পারে।
ফিচের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে বৈদেশিক অর্থায়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি আর্থিক খাত, সরকারি অর্থায়ন ও নীতিগত কাঠামোর দুর্বলতা কাটাতে সংস্কারের ধীরগতি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দীর্ঘদিনের দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক শাসনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকলেও বৈদেশিক তারল্য এখনো দুর্বল। স্বল্পসুদে বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ থাকলেও ব্যাংকিং খাতের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ফিচের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কারণ, দেশের জ্বালানি আমদানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশ ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে। একই সময়ে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার, এসেছে ওই অঞ্চল থেকে।
যদিও চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা শক্তিশালী রয়েছে, তবুও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈদেশিক খাতে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ফিচ।
ফিচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় চার মাসের বৈদেশিক পরিশোধ ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে এটি একই ধরনের অর্থনীতির দেশগুলোর গড় অবস্থানের নিচে রয়েছে।
ক্রলিং পেগ বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক অর্থায়নের কারণে আপাতত রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। কিন্তু চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়লে, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পেলে বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পরিস্থিতি আবারও চাপে পড়তে পারে।
নতুন প্রশাসনের সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ফিচ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বাড়ানোর মতো কিছু আর্থিক সংস্কার পুনর্বিবেচনার মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া গণভোটভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের অগ্রগতিও স্থবির হয়ে আছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
ফিচের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক মানদণ্ডে শাসনব্যবস্থার সূচকে বাংলাদেশ এখনো সমমানের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদে দেশের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

