আগামী বাজেটে মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর নতুন ধরনের কর আরোপের পরিকল্পনা ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল মালিকদের আয়করের আওতায় আনা এবং অগ্রিম কর বসানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে উবার ও পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে কাজ করা মোটরসাইকেল চালকরাও এই করের আওতায় আসতে পারেন। যাঁরা নিজের মোটরসাইকেল ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন বা ডেলিভারি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের ওপরও অগ্রিম কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অগ্রিম কর মূলত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তির করযোগ্য আয় আছে ধরে নিয়ে আগেই কর আদায় করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, সব মোটরসাইকেল মালিকই কি করযোগ্য আয়ের ব্যক্তি?
বর্তমানে দেশে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই সীমার বেশি আয় হলে আয়কর দিতে হয়। তবে অনেক মোটরসাইকেল চালকেরই এই সীমার নিচে আয় রয়েছে এবং তাঁদের কর শনাক্তকরণ নম্বরও নেই, আয়কর রিটার্নও দিতে হয় না। দেশে অনেক পরিবার শিক্ষার্থীদের চলাচলের সুবিধার জন্য মোটরসাইকেল কিনে দেয়। আবার কেউ কেউ টিউশনি বা অস্থায়ী আয়ের মাধ্যমে বাইক চালান। এছাড়া ডেলিভারি কর্মী এবং গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁদের বড় অংশ এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে। এই অবস্থায় তাঁদের ওপর অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি উঠেছে। চালক ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাঁদের করযোগ্য আয় নেই তাঁদের কাছ থেকে আগাম কর নেওয়া যুক্তিসংগত নয়।
বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, মোটরসাইকেল কেনা ও নিবন্ধনের সময় ইতিমধ্যে ক্রেতারা নানা ধরনের কর ও মাশুল দেন, যার পরিমাণও কম নয়। নতুন করে অগ্রিম কর আরোপ অযৌক্তিক হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মোটরসাইকেল বিক্রি কমে গেছে। সরকার শিল্প খাতে উৎসাহ দেওয়ার পরও একের পর এক নীতিগত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা খাতটির জন্য ক্ষতিকর।
কর কত হতে পারে:
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে মোটরসাইকেল মালিকদের করের আওতায় আনার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সূত্র জানায়, কম সিসির মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর না বসানোর বিষয়ে একমত হয় বৈঠক। তবে নির্দিষ্ট সিসি অনুযায়ী কর নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। ১১১ থেকে ১২৫ সিসির মোটরসাইকেলে বছরে ২ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসিতে ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি হলে বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। কিভাবে এই কর আদায় হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আরও পর্যালোচনা করছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে হতে পারে।
বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, বাস ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম কর আদায় করা হয়। এসব কর বার্ষিক আড়াই হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে এবং তা চূড়ান্ত কর হিসেবেই গণ্য হয়। করযোগ্য আয় না থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয় না। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা চালু হলে সেটিও একই নিয়মে প্রযোজ্য হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখন বাজারে উচ্চমূল্যের মোটরসাইকেলও রয়েছে। তাই তুলনামূলক বেশি সিসির মোটরসাইকেল মালিকদের করের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় আছে।
কেন অগ্রিম করের চিন্তা:
কর কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান, আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে করযোগ্যতা অনুমান করা যায়। সেই ধারণা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম কর আদায় করা হয়। তাদের যুক্তি, বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই অগ্রিম কর সমন্বয় করা যায়। তবে সমালোচকদের মতে, মোটরসাইকেল মালিকদের সবাইকে একইভাবে করযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
রাজস্ব আদায়ের চাপের কারণে অনেক সময় সহজ পথে গিয়ে উৎসে বা অগ্রিম কর বসানো হয়। ফলে যাঁদের প্রকৃত আয় নেই, তাঁদের ওপরও করের চাপ তৈরি হয়। এনবিআরের সাবেক এক সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, ধনী পরিবারের সদস্যদের দামি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে নিম্ন আয়ের বা জীবিকার তাগিদে মোটরসাইকেল চালানো মানুষের ওপর এই কর চাপানো ঠিক হবে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। তবে এর একটি অংশ এখন আর সড়কে নেই। দেশে ২০১৮ সালের পর মোটরসাইকেল উৎপাদন খাতে প্রায় ১০টি কারখানা গড়ে উঠেছে। ভারত ও জাপানের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের বাইক এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। এতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।
২০১৮ সালের নীতিমালায় ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে বিক্রি কমছে। ২০২২ সালে বিক্রি ছিল প্রায় ৬ লাখ, যা ২০২৫ সালে কমে ৪ লাখ ৬৪ হাজারে নেমে এসেছে।
এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে স্থিতিশীল নীতি প্রয়োজন। বারবার নীতির পরিবর্তন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি আরও বলেন, দেশে গণপরিবহনের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনেই মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। করপোরেট খাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন। তাই এই খাতে অতিরিক্ত কর আরোপ মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে।
ঢাকার রাস্তায় রাইড শেয়ারিং চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা অনেকেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সুমন রহমান নামের এক চালক বলেন, দিনে দীর্ঘ সময় মোটরসাইকেল চালিয়ে শারীরিকভাবে অনেক কষ্ট হয়। তিনি জানান, এই কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।

