আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন মসলার মতো দৈনন্দিন পণ্যে বিদ্যমান ১ শতাংশ উৎস কর বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের ওপর থাকা ১ শতাংশ টার্নওভার করও যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআর সূত্র বলছে, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো বাজারে সরবরাহ পর্যায়ে খরচ কিছুটা কমানো, যাতে ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ কমে আসে।
বিলাসপণ্য ও উচ্চবিত্তের ওপর বাড়তি কর:
অন্যদিকে উচ্চ আয়ের শ্রেণিকে লক্ষ্য করে বিলাসবহুল পণ্যে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি, জিপ, হেলিকপ্টার ও বিমান।এছাড়া পরিবেশবান্ধব হলেও উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপরও অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি মূলত উচ্চ আয়ের ভোক্তাদের ওপর করের চাপ পুনর্বিন্যাসের অংশ।
আগ্নেয়াস্ত্র মালিকদের ক্ষেত্রেও কর কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পিস্তল, রিভলভার ও শটগান লাইসেন্স নবায়নে কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর। বর্তমানে পিস্তল বা রিভলভারের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং শটগান বা রাইফেলের জন্য ১০ হাজার টাকা নবায়ন ফি দিতে হয়। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১০ শতাংশ উৎসে কর যুক্ত রয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, অস্ত্রভেদে নবায়ন ফি ও কর মিলিয়ে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপ হতে পারে।
ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রথমবার করের আওতায়:
প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে বাজেটে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে এ খাতে কর আদায় বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ রিকশার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ এবং কর আদায় ব্যবস্থাপনা এখনো জটিল।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারের লক্ষ্য সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া এবং উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো। তার ভাষায়, যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের ওপর করের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কর আদায়ের মাধ্যমে এই খাতকে নিয়মের মধ্যে আনা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল করা সরকারের উদ্দেশ্য।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষ ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ ও মসলার দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় করনীতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে কর কমলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কিছুটা হ্রাস পেতে পারে, যার প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়তে পারে। তবে তারা এটিও মনে করেন, শুধু কর কমালেই বাজারে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তন আসবে না। পরিবহন ব্যয়, মজুতদারি, বাজার সিন্ডিকেট, আমদানিনির্ভরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দাম নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স রয়েছে মোট ৫৩ হাজার ৭০২টি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৪ হাজার ৮৫৪টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫টি লাইসেন্স রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, ৫০ হাজার লাইসেন্সধারী গড়ে ২০ হাজার টাকা করে নবায়ন ফি দিলে এবং ভ্যাট ও কর যুক্ত হলে বছরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। নতুন লাইসেন্স ও অন্যান্য কর যুক্ত হলে এই আয় আরও বাড়বে।
২০২৫ সালের নীতিমালায় আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ফি ইতোমধ্যে বাড়ানো হয়েছিল। পিস্তল ও রিভলভারের লাইসেন্স ইস্যু ফি ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা করা হয় এবং নবায়ন ফি ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়। রাইফেল ও শটগানের লাইসেন্স ইস্যু ফি ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। অস্ত্র ব্যবসায়ী ও মেরামতকারীদের ফি ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা করা হয়।
আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্সের জন্য আয়ের শর্তও কঠোর করা হয়েছে। বর্তমানে পিস্তল বা রিভলভারের আবেদনকারীর জন্য গত তিন বছরে বছরে ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা আয়কর প্রদানের প্রমাণ প্রয়োজন, যা আগে ছিল ৩ লাখ টাকা। শটগানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম আয়কর সীমা ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১ লাখ টাকা।
বিলাসবহুল গাড়ি, জিপ, হেলিকপ্টার ও বিমানের ওপর বাড়তি কর আরোপের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বিলাসবহুল গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে মধ্যবিত্তদের জন্য গাড়ির দাম যাতে সহনীয় থাকে, সে জন্য সিসি অনুযায়ী কর কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

