বণিক বার্তা আয়োজিত ১১ মে’র সোনার বাংলা নীতি আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘বৈশ্বিক অস্থিরতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথরেখা’।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ছিলেন মূল আলোচক। তার বক্তৃতায় পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির চালচিত্র, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ ও পুনর্গঠনের রূপরেখা উঠে এসেছে। তার আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমার মনে কিছু প্রশ্ন উঠেছে যা তুলে ধরার জন্য এ লেখা। যেমন মন্ত্রী মহোদয় পূর্ববর্তী সরকার বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার নাকি ৫ আগস্ট ২০২৪-পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার, পরিষ্কার করেননি।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের পর ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের একটি দল প্রণীত শ্বেতপত্র অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল, তবে তাদের গৃহীত নানা উদ্যোগ যে সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের নিম্নগতি রোধ করে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হয়েছিল মাননীয় মন্ত্রীর বক্তব্যে তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী জানালেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকির সঙ্গে বসে বাস্তবায়নের নানা পর্যায়ে থাকা বিভিন্ন প্রকল্প যাচাই-বাছাই শেষে তারা কিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ এবং বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে থাকা কিছু প্রকল্প দ্রুত শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উপরিউক্ত এ সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। তবে যা প্রয়োজন তা হলো প্রকল্প গ্রহণ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, যার আলোকে গৃহীত হবে পরবর্তী প্রকল্পগুলো।
মন্ত্রীর বক্তব্যে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত আরেকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা যাক। এরই মধ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কি? তা যদি না হয়, সেক্ষেত্রে পুরো বিনিয়োগই বরবাদ, শুধু তা-ই নয়, এসব প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ সরকারের যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার পুরোটাই নিছক অপচয়। দুটো বাস্তব উদাহরণ দেয়া যাক।
সম্প্রতি আমি কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম। নান্দনিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কক্সবাজার রেলস্টেশন দেখে আমি মুগ্ধ। খোঁজ নিয়ে যখন আমি জানলাম, স্টেশনের নির্মিত ১ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর স্পেসের বর্তমান ব্যবহার মাত্র ৩০ শতাংশ, বাকিটা অব্যবহৃত রয়েছে, তখন মুগ্ধতা উবে গেল। ধারণা করা হয়েছিল, বর্তমানে অব্যবহৃত স্পেসের ব্যবহার হবে যখন ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত হবে স্বল্পবিত্ত পর্যটকদের ব্যবহার উপযোগী বেশকিছু কক্ষ, যারা কক্সবাজারে রাত্রি যাপন না করে সমুদ্রসৈকত ও কক্সবাজারের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান দিনে দিনে দেখে ফিরে যাবে, তাদের জন্য লেফট লাগেজ সুবিধা এবং সবার জন্য একটি উন্নতমানের সাশ্রয়ী ফুডকোর্ট। কিন্তু বারবার টেন্ডার আহ্বান করা সত্ত্বেও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের কোনো সাড়া মিলছে না। এর সম্ভাব্য কারণ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট, যা ভাঙতে হলে টেন্ডার দেশী/বিদেশী উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
পরদিন কক্সবাজার থেকে কর্ণফুলী টানেল যোগে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কর্ণফুলী টানেল রিসোর্ট দেখতে গিয়ে একই রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। পার্কি সমুদ্রসৈকতের সন্নিকটে সমুদ্রের তীরঘেঁষে অনেকটা জায়গাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে মনোরম এ রিসোর্ট। অভ্যর্থনা কেন্দ্র, সুরম্য মসজিদ, মিউজিয়াম এবং অন্যন্য সুবিধাসহ এ রিসোর্টে আছে উচ্চবিত্ত দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ব্যবহার উপযোগী সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সুসজ্জিত ৩০টি বাংলো যার প্রতিটির ব্যালকনি থেকে দেখা যায় সমুদ্র, মধ্যবিত্ত পর্যটকদের ব্যবহার উপযোগী আবাসন সুবিধা, প্রেসিডেন্ট/প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহার উপযোগী টেনিস কোর্টসহ সুপরিসর সুসজ্জিত ম্যানসন এবং সব অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত সমুদ্র সৈকত। তবুও রিসোর্টে কোনো পর্যটক নেই।
অর্থাৎ বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত রিসোর্টের বর্তমানে কোন আয় নেই, আছে শুধু রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। আমার প্রস্তাব রিসোর্টটি দেখার আমন্ত্রণ জানানো হোক কিছু খ্যাতিমান আন্তর্জাতিক ট্যুর-রিসোর্ট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে। তারপর উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিজয়ী দেশী-বিদেশী আগ্রহী উদ্যোক্তাকে দেয়া হোক দীর্ঘকালীন রিসোর্ট পরিচালনা চুক্তি।
সরকারকে যে বিষয়ে জোর দিতে হবে তা হলো, যেকোনো বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে জানতে হবে প্রকল্পটির আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল কিনা, থাকলে একই উদ্দেশ্য আরো কম ব্যয়ে অন্য কোনোভাবে সাধন করা যেত কিনা এবং প্রকল্প শেষ হলে তার দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরো বেশি বরাদ্দ দেবেন এবং শিক্ষা খাতের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাবদ বেশি বরাদ্দ দেবেন। উপরোক্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রশংসনীয়। মন্ত্রী মহোদয়কে এজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। তবে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া আবশ্যক। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম যথাযথভাবে নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেই আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত জুলাই-জুন অর্থবছর দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কতটা সহায়ক সে বিষয়ে একটি বস্তুনিষ্ঠ সমীক্ষার প্রয়োজন আছে। বাজেট বরাদ্দের পর অর্থছাড়, তারপর প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে এতটা সময় লেগে যায় যে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশে বর্ষাকাল এসে যায়, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আদৌ অনুকূল নয়।
- মোহাম্মদ মাসুম: অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতির অধ্যাপক

