বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সরকারি সুকুক বন্ডে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এখন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সুকুকের মাধ্যমে সরকার মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ নিলামে সরকার ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও এর বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে প্রায় ৭২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার। অর্থাৎ বন্ডটির মূল মূল্যের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের এমন ব্যাপক আগ্রহ দেশের আর্থিক বাজারে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের চাহিদা কতটা বেড়েছে, সেটিই স্পষ্ট করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার
সর্বশেষ সুকুক ইস্যুর অর্থ মূলত গ্রামীণ সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় করা হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে, যাতে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে সুকুক ব্যবহারের ফলে সরকার একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করতে পারছে, অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্যও নিরাপদ একটি ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
কেন বাড়ছে সুকুকের জনপ্রিয়তা?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক ইস্তেকেমাল হোসেন জানিয়েছেন, বাজারে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। তবে নিরাপদ ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ কম থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষায় ছিলেন।
তার মতে, সুকুকের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সরাসরি সরকার সমর্থিত বিনিয়োগ মাধ্যম। দ্বিতীয়ত, অনেক বিনিয়োগকারী বেসরকারি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছেন না। ফলে সরকারি সুকুককে তারা তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে?
এ পর্যন্ত সংগৃহীত ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এসেছে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যক্তিগত প্লেসমেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে, যা গত বছরের ডিসেম্বরে চালু হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে ইস্যু করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের পক্ষে এই সুকুক নিলাম পরিচালনা করছে। বুধবার সাত বছর মেয়াদি সর্বশেষ সুকুক বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা, ব্যক্তি বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন প্রভিডেন্ট ফান্ডের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
সামনে আরও বড় পরিকল্পনা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুনের মধ্যে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের বন্ডই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ধারাবাহিক সুকুক ইস্যু ভবিষ্যতে দেশের পুঁজিবাজার ও ইসলামী অর্থব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের ইসলামী বিনিয়োগ তহবিলকে আকৃষ্ট করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতির জন্য কী বার্তা দিচ্ছে?
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সরকারের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুকুক সেই সুযোগ তৈরি করছে।
একদিকে সরকার উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন পাচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ ও শরিয়াহসম্মত একটি মাধ্যম পাচ্ছেন। ফলে দেশের আর্থিক বাজারে বিকল্প বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে ওঠার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সুকুক বাজারকে আরও কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ দীর্ঘমেয়াদে এই বাজারের স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর।

