আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের বরাদ্দ বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রাথমিক প্রাক্কলন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবার মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক খাতকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ব্যয় কাঠামো সাজানো হচ্ছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার অন্য অনেক খাতের তুলনায় বেশি থাকছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার লক্ষ্য থেকেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগামী অর্থবছরে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়বে প্রায় ৩৯ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতেই এই খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
উন্নয়ন বাজেটেও স্বাস্থ্য খাতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এডিপি বরাদ্দ ১১ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে এ খাতে উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়বে প্রায় ৭৭ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিক্ষা খাতেও বড় আকারে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বরাদ্দ চলতি বাজেটের ৪৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে প্রায় ১৯ শতাংশ।
প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ব্যয়েও বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এডিপিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। অর্থাৎ উন্নয়ন বরাদ্দ প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির তুলনায় সরকারি ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে কম। নতুন বরাদ্দ কাঠামো বাস্তবায়িত হলে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক সেবার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ আগের মতোই বেশি বরাদ্দ পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে থাকছে। এ বিভাগের বরাদ্দ ৪২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বরাদ্দ ৩৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। এ খাতে বরাদ্দ ১২ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগে বরাদ্দ কিছুটা কমতে পারে। চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও আগামী অর্থবছরে তা কমিয়ে ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রাথমিক প্রস্তাব করা হয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, বরাদ্দের অর্থ যেন অপচয় বা দুর্নীতির মাধ্যমে নষ্ট না হয় এবং সঠিক খাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সব অঞ্চলের বাস্তবতা এক নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, বর্তমানে শিক্ষার মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। তাই কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন বা শিক্ষক প্রশিক্ষণ নয়, শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পঠনপাঠনের মানোন্নয়নেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

