আয়কর রিটার্ন জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ—এমন ধারণা অনেক করদাতার থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। রিটার্ন জমার পরই শুরু হতে পারে নতুন জটিলতা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নজর এখন রিটার্নে দেওয়া তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণের দিকে। সামান্য অসঙ্গতি, ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ কাগজপত্র কিংবা আয় ও ব্যয়ের মধ্যে গরমিল থাকলেই রিটার্ন চলে যেতে পারে নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায়।
এ বছর ইতোমধ্যে প্রায় ৮৮ হাজার করদাতার আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ করবর্ষের এসব রিটার্ন সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বাছাই করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। এতে আগের মতো ব্যক্তিগতভাবে কাউকে বেছে নেওয়ার সুযোগ কমে গেছে বলে দাবি করা হলেও করদাতাদের উদ্বেগ কমছে না।
দেশে বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দিয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক রিটার্নের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বা সন্দেহজনক তথ্য শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহার করছে এনবিআর।
কর কর্মকর্তাদের মতে, কিছু নির্দিষ্ট অসঙ্গতি রিটার্নকে সহজেই নিরীক্ষার তালিকায় নিয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আয় ও বাস্তব আর্থিক লেনদেনের মিল আছে কি না, সেই বিষয়ে। ব্যাংক হিসাব, উৎসে কর কর্তনের তথ্য, ব্যবসায়িক লেনদেন, সম্পদ ও বিনিয়োগের হিসাবের সঙ্গে রিটার্নের তথ্য না মিললে করদাতা ঝুঁকিতে পড়েন।
যেসব বিষয় এখন বেশি যাচাই হচ্ছে:
আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য: রিটার্নে কম আয় দেখিয়ে বেশি ব্যয় বা সম্পদ দেখানো হলে তা সন্দেহের কারণ হয়। ব্যাংক লেনদেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যয়, গাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার তথ্য সহজেই যাচাই করা হচ্ছে।
হঠাৎ সম্পদ বৃদ্ধি: আগের বছরের তুলনায় হঠাৎ সম্পদ বেড়ে গেলে তার উৎস জানতে চাওয়া হয়। বৈধ উৎস প্রমাণ না করতে পারলে জটিলতা তৈরি হয়।
ব্যবসায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো; কর কমানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে লাভ কম দেখানোর প্রবণতা এখন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উৎসে করের অসঙ্গতি: চাকরি, ব্যাংক সুদ বা ঠিকাদারি বিলসহ বিভিন্ন খাতে উৎসে কর কাটা হলেও রিটার্নে ভুল তথ্য থাকলে তা ধরা পড়ে যায়।
অসম্পূর্ণ কাগজপত্র: আয়-ব্যয়, সম্পদ বা বিনিয়োগের প্রমাণ যথাযথভাবে না থাকলে কর কর্মকর্তারা আপত্তি তুলতে পারেন।
অস্বাভাবিক নগদ অর্থ: বড় অঙ্কের নগদ অর্থ দেখানো হলেও তার উৎস ব্যাখ্যা না থাকলে তা সন্দেহ তৈরি করে।
অস্বাভাবিক ঋণ বা দায়: রিটার্নে বড় ঋণ বা দায় দেখানো হলে তার বৈধ কাগজপত্র থাকা জরুরি।
সম্পদ গোপন করা: জমি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি রিটার্নে উল্লেখ না করলে পরে ধরা পড়লে বড় সমস্যায় পড়তে হয়।
ভুল বিনিয়োগ তথ্য: কর ছাড় পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত বা ভুল বিনিয়োগ দেখানোর বিষয়ও এখন যাচাই করা হচ্ছে।
অনেক করদাতা জানতেই পারেন না তাদের রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে কি না। এখন এটি জানা সহজ হয়েছে। এনবিআরের ওয়েবসাইটে নিরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করদাতাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তালিকা ফাইলে টিআইএন নম্বর দিয়ে সহজেই যাচাই করা যায়। প্রথম দফায় গত জুলাইয়ে ১৫ হাজার ৪৯৪টি রিটার্ন নিরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও ৭২ হাজার ৩৪১ করদাতার রিটার্ন যুক্ত করা হয়েছে।
কর অফিসের নোটিশ এলে করণীয়:
করদাতাদের কাছে নোটিশ পাঠানোর হারও বেড়েছে। এতে রিটার্ন না দেওয়া, কর কম দেওয়া বা তথ্যের অসঙ্গতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নোটিশ পেলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত ও সঠিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নোটিশ অবহেলা না করা: অবহেলা করলে একতরফা সিদ্ধান্ত, জরিমানা বা আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নোটিশ ভালোভাবে পড়া: কোন বিষয়ে আপত্তি, কী তথ্য চাওয়া হয়েছে তা বুঝতে হবে।
সময়সীমা মানা: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে সমস্যা বাড়ে।
প্রমাণ প্রস্তুত রাখা: ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বেতন সনদ, সম্পদের কাগজ, বিনিয়োগের নথি গুছিয়ে রাখতে হবে।
প্রয়োজনে সময় বাড়ানো: প্রস্তুতির জন্য সময় চাইলে কর কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা যায়।
বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়া: জটিল বিষয় হলে অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া উত্তম।
এখনও রিটার্ন না দিলে কী হবে: নির্ধারিত সময় ৩১ মার্চ শেষ হলেও এখনো বকেয়া রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আগের দুই বছরের রিটার্নও দেওয়া যাবে। তবে এতে জরিমানা ও অতিরিক্ত সুদ দিতে হবে।
কর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিলম্বে রিটার্ন দিলে নির্ধারিত করের ওপর ২ শতাংশ হারে সুদ আরোপ হয়, যা সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত চলতে পারে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো কর ছাড়ের সুযোগ হারানো। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দিলে বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়া যায় না। যারা সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন, তারা জরিমানা ছাড়াই সুবিধা পাবেন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, টিআইএনধারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও অনেকেই নিয়মিত রিটার্ন দেন না। বিভিন্ন সেবা নিতে বাধ্য হয়ে অনেকে টিআইএন নিলেও পরে রিটার্ন জমা দেন না। এ কারণে করজাল সম্প্রসারণ ও কর ফাঁকি কমাতে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংক, ভূমি নিবন্ধন, গাড়ি নিবন্ধন, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন খাতের তথ্য একত্রিত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন আয় গোপন বা সম্পদ লুকানো আগের চেয়ে অনেক কঠিন। তাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো সঠিক তথ্য দিয়ে নিয়মিত রিটার্ন জমা দেওয়া এবং সব আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা।

