গত এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। তবে এই অর্থের বড় অংশই আবার আগের ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যয় হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারকে নিয়মিতভাবেই ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়ায় এই সময় ঋণ গ্রহণও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের সংগ্রহ ছিল প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায়, যা প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আগের ইস্যু করা ট্রেজারি বিল পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায়।
ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিলের সুদের হারও এপ্রিলে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। মাসের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় শেষ সপ্তাহে বিভিন্ন মেয়াদের বিলের সুদহার বেড়ে যায়। ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৮২ দিন মেয়াদির ক্ষেত্রে ১০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একইভাবে ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশে পৌঁছায়।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারি ব্যয়ের চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। সে কারণেই এ সময় ঋণ গ্রহণও বৃদ্ধি পায়। এপ্রিলে সেই প্রবণতাই স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ট্রেজারি বিলের বড় অংশই ব্যাংক খাত থেকে এসেছে। উচ্চ সুদের কারণে সরকারকে ঋণ দিয়ে ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা পাচ্ছে। ফলে তারা এখন বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকারের কাছেই বেশি অর্থ দিতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা, যা ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশ।
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ। তার মতে, এই ব্যবস্থায় মূল সুবিধাভোগী হচ্ছে ব্যাংক খাত, সাধারণ জনগণ নয়। তিনি বলেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো সহজেই নিশ্চিত মুনাফা অর্জন করছে। কিন্তু ব্যাংকের মূল কাজ হওয়া উচিত ভালো গ্রাহক খুঁজে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন করা।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়, তবে তা জনগণের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে করা উচিত। বর্তমানে কোটার কারণে ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ বেশি থাকায় তারা বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার বদলে এখানে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূচি অনুযায়ী, এই সময়ে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হবে।
এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি বিল থেকে ৪৪ হাজার কোটি, ১৮২ দিন মেয়াদি থেকে ৩৬ হাজার কোটি এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে রোববার অনুষ্ঠিত নিলামের মাধ্যমে এসব ঋণ নেওয়া হবে। একই সময়ে ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে আরও ৩৯ হাজার কোটি টাকার মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। দুই বছর মেয়াদি বন্ড থেকে ১১ হাজার ৫০০ কোটি, তিন বছর মেয়াদি থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি, পাঁচ বছর মেয়াদি থেকে ৯ হাজার ৫০০ কোটি এবং ১০ বছর মেয়াদি বন্ড থেকে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়া হবে।
এছাড়া ১৫ বছর ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ড থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি করে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে রাজস্ব আহরণেও বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এই সময়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।
শুধু মার্চ মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ঘাটতি দেখা যায়। ওই মাসে ৬০ হাজার ৫০ কোটি টাকা লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। এই পরিস্থিতিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকার বাধ্য হয়ে ঋণ নিচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করলে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ে। তাই এ বিষয়ে সরকারকে সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব বাড়াতে নতুন করদাতা যুক্ত করা জরুরি। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ ও আদায় দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তার মতে, ঋণ নির্ভরতা বাড়লে শুধু সুদ পরিশোধের চাপই নয়, অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে অর্থবছরের শুরু থেকেই ঋণ গ্রহণের গতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে মোট ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে শুধু ব্যাংক খাত থেকেই এসেছে ৬৪ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা।
গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ ছিল মাত্র ১৫ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। সব অভ্যন্তরীণ উৎস মিলিয়ে তখন ঋণ নেওয়া হয়েছিল ৪০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। সেই তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও বেড়েছে। চলতি মে মাসেই এখন পর্যন্ত সরকার এসব মাধ্যমে ২১ হাজার ২৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ১১ মে অনুষ্ঠিত নিলামে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ১৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়, যেখানে সুদের হার ছিল ১০ শতাংশের ওপরে। একই সময়ে ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমেও ৭ হাজার ৫২১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এখানেও সুদের হার ১০ শতাংশের বেশি ছিল বলে জানা গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট সরকারি ঋণ প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় ঋণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১ লাখ ৪৭ হাজার ২৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা ধরে)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সরকারের ঋণ জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত দায়িত্ব। ঋণের পরিমাণ ও চাহিদা নির্ধারণ করে সরকারই। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের আয়োজন করে। তিনি আরও বলেন, আগে শুধু ব্যাংক ও কিছু প্রতিষ্ঠানই সরকারি সিকিউরিটিজ কিনতে পারত। তবে এখন সাধারণ ব্যক্তিও এসব সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারছেন।

