সম্পূর্ণ অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন, অনুমোদন এবং অর্থ গ্রহণের সুবিধাসম্পন্ন ডিজিটাল ঋণসেবার নাম ই-লোন। এই ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যায়। দ্রুত সময়ে এবং সহজ প্রক্রিয়ায় ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় এটি গ্রাহকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
তবে সহজ সুবিধার পাশাপাশি এতে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে ঋণখেলাপির সম্ভাবনা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ব্যাংকগুলোর জন্য এ ধরনের সেবায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কথা উঠলেই সাধারণত এক ধরনের প্রচলিত চিত্রই সামনে আসে। ব্যাংকে যাওয়া, ফরম পূরণ করা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো এবং শেষে ঋণের টাকা পাওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা—এটাই এতদিনের অভিজ্ঞতা ছিল অনেক গ্রাহকের জন্য।
কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই পুরোনো চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের কয়েকটি ক্লিকেই ঋণের আবেদন করা যাচ্ছে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনেই সম্পন্ন হচ্ছে। এমনকি ঘরে বসেই সরাসরি ঋণের অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থাও তৈরি হয়েছে। এই আধুনিক ব্যবস্থাকেই বলা হচ্ছে ‘ই-লোন’ বা ডিজিটাল ঋণ। এতে পুরো ঋণ প্রক্রিয়া—আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন এবং অর্থ বিতরণ—সবকিছুই সম্পন্ন হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে।
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সেবার পরিসর বাড়াচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত ১১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার আওতায় এ বিষয়ে একটি নীতিমালা বা সার্কুলার জারি করে।
এ প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে। ই-লোন আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে, কারা এই সুবিধা নিতে পারবেন, এর সুবিধা ও ঝুঁকি কী, এবং বাংলাদেশে এই সেবা কতটা নতুন—এসব বিষয় নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
ই-লোন কী?
ই-লোন হলো এমন একটি আধুনিক ঋণসেবা, যেখানে ঋণের আবেদন, যাচাই-বাছাই, অনুমোদন এবং অর্থ বিতরণ—সবকিছুই সম্পন্ন হয় সম্পূর্ণ অনলাইনে। এই ব্যবস্থায় গ্রাহককে ব্যাংকের শাখায় সরাসরি যেতে হয় না। গ্রাহক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিয়ে ঋণের জন্য আবেদন করতে পারেন। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের আয়, লেনদেনের ইতিহাসসহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থায় সময় যেমন কম লাগে, তেমনি দ্রুত সেবা পাওয়া সম্ভব হয়। তবে একই সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা এবং ঋণের শর্তগুলো ভালোভাবে বোঝার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
ই-লোন কি বাংলাদেশে নতুন?
এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে—না। কারণ বাংলাদেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কয়েক বছর ধরেই ই-লোন সেবা চালু রয়েছে।
দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংগঠন বেসিসের সাবেক সভাপতি এবং বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর জানান, বিষয়টি নতুন নয়। তাঁর ভাষায়, বিকাশ ও সিটি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে যে সেবা চালু হয়েছিল, সেটিই মূলত ই-লোনের উদাহরণ। সেখানে ঋণ প্রদান করে সিটি ব্যাংক, আর বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করার সুযোগ দেয়। শুরুতে এই ঋণের সীমা ছিল ২০ হাজার টাকা, পরে তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্কুলারের ফলে এখন দেশের যেকোনো ব্যাংকই এই ধরনের ডিজিটাল ঋণসেবা চালু করতে পারবে।
মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিনও বিষয়টি একইভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, আগে কিছু ব্যাংক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই সেবা চালু করলেও এখন এটি দেশব্যাপী সব ব্যাংকের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল ঋণ দেওয়া নতুন কিছু নয়, বরং এটি আগেরই একটি পদ্ধতির সম্প্রসারিত রূপ।
তিনি আরও বলেন, ই-লোন আলাদা কোনো ঋণের শ্রেণি নয়, বরং এটি ঋণ প্রদানের একটি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি মাত্র। প্রচলিত এসএমই বা করপোরেট ঋণের মতো আলাদা ক্যাটাগরি হিসেবে একে দেখা হয় না। বর্তমানে ঋণের শ্রেণিবিন্যাসে এসএমই খাতের পাশাপাশি কটেজ ও মাইক্রো খাত যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে সিএমএসএমই খাত—কটেজ, মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ। এই কাঠামোর মধ্যেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে ই-লোন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ই-লোনের শর্ত কী কী?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ডিজিটাল ঋণসেবার নাম হবে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ই-লোন’। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কিছু শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। ঋণের মেয়াদও নির্দিষ্ট করা হয়েছে—সর্বোচ্চ এক বছর বা ১২ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সুদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, এটি বাজারভিত্তিক হবে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদের হার নির্ধারণ করতে পারবে। তবে যদি কোনো ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় এই ঋণ দেয়, তাহলে সেক্ষেত্রে সুদের হার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
অর্থাৎ, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থাকলে গ্রাহকের কাছ থেকে ৯ শতাংশের বেশি সুদ নেওয়া যাবে না। তবে ব্যাংক চাইলে এর চেয়েও কম সুদ নির্ধারণ করতে পারবে। এ বিষয়ে ফাহিম মাশরুর বলেন, বর্তমানে সিটি ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে যে ই-লোন দেওয়া হচ্ছে, তার সুদের হারও প্রায় ৯ শতাংশ। তবে ব্যাংক চাইলে এর নিচে নামিয়ে আনার সুযোগও রয়েছে।
ই-লোন প্রক্রিয়ায় আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদন এবং অর্থ বিতরণ—সবই সম্পন্ন হবে অনলাইনে। এই ব্যবস্থায় গ্রাহককে কাগজে স্বাক্ষর করার প্রয়োজন হবে না। এর পরিবর্তে বায়োমেট্রিক তথ্য ও দুই স্তরের নিরাপত্তা যাচাইয়ের মাধ্যমে সম্মতি নেওয়া হবে। তবে ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংক গ্রাহকের ঋণ ইতিহাস বা সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) রিপোর্ট যাচাই করবে। বিশেষ বিষয় হলো, এই ডিজিটাল ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি অনুসন্ধানের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ গ্রাহক বা ব্যাংক কাউকেই দিতে হবে না।
এছাড়া স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ঋণখেলাপিদের এই সুবিধা দেওয়া হবে না। ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭কক ধারার বিধান অনুযায়ী খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ প্রদান থেকে বিরত থাকতে ব্যাংকগুলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আরও বলা হয়েছে, ঋণ বিতরণের আগে গ্রাহকের অন্যান্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের তথ্যও যাচাই করতে হবে।

