আগামী বাজেটে মোটরসাইকেলের মালিকদের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এমন সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই দেশজুড়ে মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এর প্রতিবাদে গতকাল রোববার সকালে কয়েক শ” মোটরসাইকেলচালক বিক্ষোভ করেন এবং এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। তাঁদের দাবি, করযোগ্য আয় না থাকা সাধারণ বাইকারদের ওপর নতুন কর চাপানো অযৌক্তিক হবে।
তবে শুধু মোটরসাইকেল মালিকরাই নন, দেশে বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ নানা ধরনের অগ্রিম করের আওতায় রয়েছেন। আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, গাড়ির মালিক কিংবা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনকারী নাগরিকদেরও আগাম কর দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব করের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও করদাতাদের তা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এনবিআর সূত্র বলছে, দেশে আয়কর আদায়ের বড় অংশই আসে উৎসে কর বা অগ্রিম কর থেকে। প্রতি বছর যে পরিমাণ আয়কর আদায় হয়, তার দুই–তৃতীয়াংশেরও বেশি সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন খাতে আগাম কর কেটে রেখে। এখন প্রশ্ন উঠছে, সরকার কেন অগ্রিম আয়কর নেয় এবং এই ব্যবস্থা কতটা যৌক্তিক।
সামাজিক অবস্থান ও সম্পদের ভিত্তিতে কর:
এনবিআরের মতে, কোনো ব্যক্তির আয়, বাড়ি, গাড়ি বা সম্পদের পরিমাণ দেখেই বোঝা যায় তিনি করযোগ্য আয়ের অধিকারী কি না। তাই এসব নাগরিকের কাছ থেকে অগ্রিম কর নেওয়া হয়। পরে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সেই অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ থাকে।
তবে মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসিভেদে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম কর আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। অনেক বাইকারের দাবি, তাঁদের অনেকেরই করযোগ্য আয় নেই। ফলে এই কর তাঁদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
রাজস্ব আদায়ে সহজ পথ:
রাজস্ব আদায়ের চাপ সামলাতে গত কয়েক বছরে এনবিআর অগ্রিম কর ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন খাতে আগাম কর বসানোর ফলে সরকার সারা বছর ধাপে ধাপে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে। এতে অর্থবছরের শেষে কর আদায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।
কর ফাঁকি কমানোর কৌশল:
পণ্য আমদানি, গাড়ি নিবন্ধন, জমি বিক্রি কিংবা ব্যাংক লেনদেনের সময় আগেই কর কেটে নেওয়া হলে আয়ের তথ্য গোপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে কর ফাঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয় বলে মনে করে কর কর্তৃপক্ষ।
ধাপে ধাপে কর দেওয়ার অভ্যাস:
এককালীন বড় অঙ্কের কর পরিশোধের পরিবর্তে ধাপে ধাপে কর দেওয়ার সুযোগও তৈরি হয় এই ব্যবস্থায়। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন–ভাতা দেওয়ার সময় নির্ধারিত কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়।
অপ্রদর্শিত আয় শনাক্তে সহায়ক:
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যয় ও লেনদেনের সঙ্গে আয়কর রিটার্নে দেওয়া তথ্যের অসংগতি খুঁজে বের করতেও অগ্রিম কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে গোপন আয় শনাক্ত করা সহজ হয়।
ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নজরদারিতে:
আমদানি, রপ্তানি, পরিবহন, ঠিকাদারি বা কমিশনভিত্তিক ব্যবসায় অগ্রিম কর নেওয়ার ফলে সরকারের কাছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য জমা হয়। এতে ব্যবসায়িক লেনদেন পর্যবেক্ষণ সহজ হয়।
করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা:
উৎসে কর কাটা বা অগ্রিম কর নেওয়ার মাধ্যমে পরে আলাদা করে কর আদায়ের চাপ কমে যায়। ফলে করব্যবস্থা আরও স্বয়ংক্রিয় ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
সরকারের নগদ অর্থপ্রবাহ বাড়ে:
উন্নয়ন ব্যয়, সরকারি বেতন–ভাতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য সরকারের নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়। অগ্রিম কর সারা বছর সংগ্রহ হওয়ায় নগদ অর্থপ্রবাহ বজায় রাখা সহজ হয়।
করের আওতা বাড়ানোর উপায়:
অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা না দিলেও বিভিন্ন সেবা গ্রহণের সময় অগ্রিম কর দেওয়ার মাধ্যমে তারা কর নেটের আওতায় চলে আসে।
তথ্যভান্ডার তৈরিতে সহায়ক:
ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ ক্রয়–বিক্রয় এবং আমদানিসংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে কর কর্তৃপক্ষ দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিশ্লেষণের সুযোগ পায়। এতে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণেও সহায়তা মেলে।

