আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে ভর্তুকি কমানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সরকার উল্টো ভর্তুকি ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা আরও বাড়ানোর পথেই হাঁটছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ এখন প্রায় নেই বললেই চলে।
সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণসহায়তা মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়ছে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় ব্যয় ধরা হয়েছে ভর্তুকি খাতে। আগামী অর্থবছরে ভর্তুকির জন্য সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৭২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা ছিল ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ যাচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। শুধু বিদ্যুৎ খাতেই ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগের বছরের সমান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস আমদানিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং সারে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। পরে সেই প্রভাব পড়ে শিল্প খাত ও নিত্যপণ্যের বাজারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার চাইলে পুরো ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে। কিন্তু এতে শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সেই ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে এখনই ভর্তুকি কমানো বাস্তবসম্মত নয়। তার মতে, উৎপাদন ব্যয় এবং ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান কমানো না গেলে ভর্তুকি কমানো কার্যত কঠিন হয়ে পড়বে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সরকার এখনো পুরোপুরি মুক্তবাজারভিত্তিক মূল্যব্যবস্থায় যেতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংস্কার চাপ থাকলেও বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে বড় আকারের ভর্তুকিনির্ভর ব্যবস্থাই ধরে রাখতে হচ্ছে।
খাদ্য খাতেও সহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী বাজেটে খাদ্য ভর্তুকি ধরা হচ্ছে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় বেড়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওএমএস, টিসিবি এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সারা বছর চালু রাখার কারণেই ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে কৃষি খাতে প্রণোদনা ১৭ হাজার কোটি টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। কারণ সার আমদানির উচ্চ ব্যয় ও কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সরকার কৃষকদের সহায়তা অব্যাহত রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম, জ্বালানির ব্যয় এবং কৃষি উপকরণের অনিশ্চয়তা উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এই অবস্থায় কৃষকদের সহায়তা কমানো হলে খাদ্য উৎপাদন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রণোদনা খাতেও বড় অঙ্কের সহায়তা থাকছে। মোট ৩২ হাজার ২৫ কোটি টাকা নীতিসহায়তা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানি খাতে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং পাট খাতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আগের মতোই রাখা হচ্ছে। তবে রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার, যা বর্তমানে ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ স্থিতিশীল রাখা এবং প্রবাসী আয় বাড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নগদ ঋণসহায়তা খাতে আরও ১২ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এই অর্থ বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করা হবে।
ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ এখন এক ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। একদিকে দাতা সংস্থাগুলোর শর্ত বাস্তবায়নের চাপ, অন্যদিকে সীমিত রাজস্ব আয় ও সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। ফলে ভর্তুকি এখন বাজেটের ওপর একটি স্থায়ী চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে দ্রুত বের হওয়া কঠিন।

