দেশের অর্থনীতিতে গত এক দশকে কর্মসংস্থানের গতি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। নতুন চাকরির বড় অংশ তৈরি হচ্ছে কম উৎপাদনশীল খাতে। একই সময়ে দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে প্রায় ৭০ শতাংশ অবদান রাখলেও কর্মসংস্থানে তাদের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই তৈরি পোশাক খাতের হওয়ায় নতুন শিল্পখাতকে উৎসাহ দিতে সমান সুযোগ ও প্রণোদনার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
গতকাল সোমবার ঢাকার বনানীতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। সেখানে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উপস্থাপনা দেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার।
উপস্থাপনায় ধ্রুব শর্মা বলেন, দেশে তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। যেখানে সাধারণ করপোরেট করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ, সেখানে এই খাতকে মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে। অথচ দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ তৈরি হয়েছে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র-মাঝারি খাতে।
তিনি জানান, প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ নতুন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের অর্ধেকের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বেশির ভাগ নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে কৃষিভিত্তিক খাতে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে নতুন নতুন শিল্পখাতকে সুবিধার আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ধ্রুব শর্মা। তাঁর মতে, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব এবং অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে অস্বচ্ছতার অভিযোগও রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের প্রায় ১৩ শতাংশ সময় আইনি জটিলতা সামাল দিতে ব্যয় হয়। বরিশালে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই বাজার প্রতিযোগিতা সবচেয়ে কম বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, দেশে একটি ব্যবসা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে গড়ে ১০ হাজার ডলার ব্যয় হয়।
সেমিনারে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা নিয়েও আলোচনা হয়। বলা হয়, খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনা হলেও ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির বিষয়টি আড়ালে থেকে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা ১০ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে। দেশের ২২টি ব্যাংকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত মূলধন ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত সংস্কারের ওপর জোর দেন বক্তারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধির ধারা চলছে। প্রবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া হলেও তা টেকসই করার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, কোনো একটি খাত অনির্দিষ্টকাল ধরে বিশেষ সুবিধা পেতে পারে না।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক টি আই এম নুরুল কবির বলেন, করকাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কয়েক বছর ধরে দেশে প্রত্যাশিত বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে চাইলেও মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তনের কারণে তারা আস্থা হারাচ্ছেন।
পিআরআইয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেন, ২০১৯ সাল থেকেই দেশের প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক সংকটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী। তাঁর মতে, এখন সংস্কার আর বিকল্প নয়, বরং অর্থনীতির জন্য জরুরি প্রয়োজন। অন্যথায় বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার পরামর্শও উঠে আসে।

