চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস শেষে বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর আগে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেও প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে ছিল সংস্থাটি। তখন প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বছর শেষে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে মে ও জুন—এই দুই মাসে প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। তবে আগের বছরের আদায়ের ধারা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহ করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।
খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে কাস্টমস খাত থেকে আদায় হয়েছে ৯০ হাজার ৭৬২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ভ্যাট খাতে আদায় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর আয়কর খাতে সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৬২২ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
তিন বিভাগের মধ্যে আয়কর খাতে প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হলেও ঘাটতির পরিমাণও সেখানে সর্বোচ্চ। আয়কর বিভাগে ঘাটতি প্রায় ৪৪ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। ভ্যাট খাতে ঘাটতি ৩৫ হাজার ৩০৮ কোটি এবং কাস্টমস খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ১৯২ কোটি টাকা।
শুধু এপ্রিল মাসের চিত্রও এনবিআরের জন্য উদ্বেগের। ওই মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৬ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। এপ্রিলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬০৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। এ সময়ে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশে।
এপ্রিলের খাতভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাস্টমস খাতে আদায় হয়েছে ১০ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। তবে ভ্যাট খাতে পরিস্থিতি ছিল নেতিবাচক। ১৮ হাজার ৩১৩ কোটি ২ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে আয়কর খাতে এপ্রিল মাসে আদায় হয়েছে ১১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। যদিও এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪ হাজার ৫৩৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। তবে আগের বছরের তুলনায় আয়কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ে ধীরগতির কারণ হিসেবে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমদানি কমে যাওয়া, ব্যবসায়িক মন্দা, কর ফাঁকি এবং প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না বাড়ায় রাজস্ব সংগ্রহে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে অর্থবছরের বাকি সময়ে আদায় কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তার আশা, এতে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমে আসবে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বড় ধরনের ঘাটতিতে ছিল এনবিআর। ওই অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের শুরুতে এনবিআরের মূল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে গত ১০ নভেম্বর বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটি তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করে।

