ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। একসময় যে বৈদেশিক ঋণের হিসাব দাঁড়িয়েছিল ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা, এখন একই ঋণের বিপরীতে সরকারের ব্যয় আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে।
মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে টাকার বিপরীতে মার্কিন মুদ্রা ডলারের ধারাবাহিক ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এতে প্রকল্পটির অর্থায়ন কাঠামোতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে রূপপুর প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ৫ হাজার ৮৮ কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা চেয়েছে সরকার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এই অর্থ ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাতের থোক বরাদ্দ থেকে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বিভাগ এবং শিল্প ও শ্রমশক্তি বিভাগে আনুষ্ঠানিক আবেদন পাঠানো হয়েছে। পরে ১৪ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এ বিষয়ে অনাপত্তি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির থোক বরাদ্দ থেকেই অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় করা যেতে পারে।
বর্তমানে চলতি অর্থবছরে রূপপুর প্রকল্পের জন্য বৈদেশিক সহায়তার বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এটি বাড়িয়ে ১৪ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এক অর্থবছরেই অতিরিক্ত ৫ হাজার ৮৮ কোটি টাকার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে রাশিয়া থেকে নেওয়া রাষ্ট্রীয় ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলার। তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮০ টাকা। সে হিসাবে মোট বৈদেশিক ঋণের টাকার অঙ্ক নির্ধারণ করা হয় ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিনিময় হার এখন দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকা ৪০ পয়সা। এতে একই ঋণের বিপরীতে সরকারের দেশীয় মুদ্রায় ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে গেছে।
চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটির প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সেখানে প্রকল্পের মেয়াদ আরও আড়াই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে শুধু ব্যয় নয় সময়ের চাপও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চিঠি এখনো হাতে পাননি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সরকারের ভেতরে নীতিগতভাবে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ১৪ মে জারি করা চিঠিতে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ ‘বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা’ খাত থেকে সমন্বয় করা হবে। এতে সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তার বরাদ্দ না বাড়লেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঋণনির্ভর প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রূপপুর প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি শুধু নির্মাণ খরচের বিষয় নয়, এর সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডলারের দাম বাড়লে একই ঋণের বিপরীতে দেশীয় মুদ্রায় ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে বড় বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিময় হার ঝুঁকি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম বলেন, রূপপুর দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগগুলোর একটি। এখানে সময় ও ব্যয় দুটোই বেড়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রকল্পের স্বচ্ছতা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক বৈদেশিক ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প।

