বিশ্বজুড়ে আবাসন সংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রায় ২৮০ কোটি মানুষ পর্যাপ্ত ও নিরাপদ বাসস্থানের অভাবে ভুগছে। এর মধ্যে ১১০ কোটিরও বেশি মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৩০ কোটির বেশি মানুষ গৃহহীন অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিকে দ্রুত বাড়তে থাকা বৈশ্বিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নগর উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে উঠছে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে চলমান বিশ্ব নগর ফোরামে আবাসন সংকটই প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, মেয়র, নগর পরিকল্পনাবিদ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নিচ্ছেন।
জাতিসংঘ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বৃদ্ধি, আয় বৈষম্য এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে আবাসন সংকট আরও জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোতে কম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থান পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। আবাসন সংকট বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝানো হয়, যেখানে নিরাপদ, উপযুক্ত ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, বরং সরাসরি অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত। নিরাপদ আবাসন না থাকলে শ্রমবাজার, উৎপাদনশীলতা এবং নগর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়ছে, ফলে ভোগব্যয়ও কমে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ মানব বসতি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বিশ্বের ১২ কোটির বেশি মানুষ নতুন করে বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। যদিও অনেক দেশ জাতীয় নগরনীতি গ্রহণ করেছে, তবুও পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি।
প্রায় ১৬০টি দেশ ইতোমধ্যে জাতীয় নগরনীতি গ্রহণ করেছে বা তা প্রণয়নের কাজ করছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশ সাশ্রয়ী আবাসন কর্মসূচি চালু করলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম বলে জানানো হয়েছে। ফোরামে সামাজিক আবাসন প্রকল্প সম্প্রসারণ, বস্তি উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর পুনর্গঠন নিয়েও আলোচনা চলছে।
সিরিয়ার হোমস শহরের মেয়র বাশার আল সেবাই বলেন, যুদ্ধ শেষে প্রায় চার লাখ মানুষ শহরে ফিরে এসেছে, তবে তারা ধ্বংসস্তূপে ফিরে এসেছে। বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পুনর্গঠনে অর্থায়ন প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘ আরও বলছে, যুদ্ধ ও জলবায়ু সংকটের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা আবাসন চাহিদার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শহরে দ্রুত জনসংখ্যা বাড়লেও অবকাঠামো সেই হারে গড়ে ওঠেনি। বন্যা, তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে অনিরাপদ আবাসনে থাকা মানুষদের।
বাকুতে ফোরামের প্রথম দিন ভারী বৃষ্টিতে শহরের অনেক সড়ক প্লাবিত হয়। স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতি খুব কম দেখা যেত। বিশেষজ্ঞরা এটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্থপতি ও টেকসই নগরায়ণ বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ল্যান্স জে ব্রাউন বলেন, বিশ্বের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও কম আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও গৃহহীনতার সমস্যা বাড়ছে। নিউইয়র্কের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতিসংঘের মতে, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা টেকসই নগর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। এ কারণে বিশ্বব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা, স্থানীয় উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফোরামের সুপারিশগুলো আগামী বছরের জাতিসংঘ মহাসচিবের নতুন নগর উন্নয়ন নীতিমালা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

