পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে আবারও বড় উত্থান দেখা যাচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারও বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা পরিবারের খরচ, কোরবানির প্রস্তুতি এবং স্বজনদের সহায়তার জন্য বেশি পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। ফলে মে মাসজুড়ে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে স্পষ্ট গতি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক–এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে এসেছে ২৬২ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা ধরে।
হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে এক হাজার ৬০৯ কোটিরও বেশি টাকার প্রবাসী আয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্যই স্বস্তির খবর নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সংকেত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করায় বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হুন্ডি বা অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অবৈধ চ্যানেলের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ায় অনেক প্রবাসী এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর বেশি আস্থা রাখছেন।
এছাড়া বৈধ পথে অর্থ পাঠালে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা সুবিধাও রেমিট্যান্স বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও দ্রুত অর্থ পৌঁছানোর সুবিধা বাড়ায় প্রবাসীদের জন্য বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানো আগের চেয়ে সহজ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদুল আজহা সামনে থাকায় মে মাসের বাকি সময়েও রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। কারণ সাধারণত কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা বাড়তি অর্থ পাঠিয়ে থাকেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের সময়ে এই বাড়তি রেমিট্যান্স অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের সামগ্রিক হিসাবেও প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছরের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ২০ মে পর্যন্ত দেশে এসেছে তিন হাজার ১৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৪৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে তা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, শুধু সাময়িক উৎসবকেন্দ্রিক প্রবাহের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, বৈধ আর্থিক চ্যানেল সম্প্রসারণ এবং প্রবাসীদের জন্য সহজ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করাই হবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ।

